যাঁদের খালি পায়ের জাদুতে একদিন ধুলিস্যাৎ হয়েছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের দুশো বছরের ঔপনিবেশিক দম্ভ,
যাঁদের রক্ত আর ঘামে লেখা হয়েছিল পরাধীন ভারতবর্ষের আত্মমর্যাদা পুনরুদ্ধারের এক অমর দলিল,
১৯১১ সালের সেই এগারো জন অকুতোভয় রূপকার—মোহনবাগানের ‘অমর একাদশ’-এর (Immortal XI) পুণ্য স্মৃতির উদ্দেশে আমাদের এই বিনীত নিবেদন।
তাঁদের সেই বুক-চিতানো স্পর্ধা, মরণপণ লড়াই আর আত্মত্যাগ আজও আমাদের শিরায় শিরায় বইয়ে দেয় অদম্য প্রেরণা।
এই রচনাটির সমস্ত ঐতিহাসিক তথ্য ও রোমাঞ্চকর বিবরণের জন্য আমরা নিম্নলিখিত সূত্রগুলির প্রতি সশ্রদ্ধ কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি:
ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধ। গঙ্গার বুক চিরে ধেয়ে আসা স্যাঁতসেঁতে হাওয়া আর ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ঔদ্ধত্যে মোড়া এক অদ্ভুত শহর—কলকাতা। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাত ধরে এদেশের মাটিতে ততদিনে শিকড় গেড়েছে সাহেবদের প্রিয় খেলা—ফুটবল। উত্তর কলকাতার শ্যামবাজার এলাকার ১ নং ফরিয়াপুকুর স্ট্রিটে তখন মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে বিশিষ্ট পাট ব্যবসায়ী কীর্তিচন্দ্র মিত্রের সুবিশাল রাজপ্রাসাদ। বাংলার প্রথম সিভিল ইঞ্জিনিয়ার নীলমণি মিত্রের নকশায় তৈরি শ্বেতপাথরের সেই অপরূপ প্রাসাদের নাম ছিল—’মোহনবাগান ভিলা’। এই ভিলাটি যে জমির ওপর দাঁড়িয়ে ছিল, সেটি এককালে রাজা নবকৃষ্ণ দেবের জ্যেষ্ঠ পুত্র রাজা গোপী মোহন দেবের বাগান ছিল।

সেই রাজকীয় ভিলার ঠিক পাশেই ছিল ১৩ বিঘার এক বিস্তীর্ণ সবুজ মাঠ। প্রতিদিন পড়ন্ত বিকেলে সেই মাঠে ঘাম ঝরায় একদল উদ্দাম তরুণ, যাদের দলটির নাম ছিল ‘স্টুডেন্টস ইউনিয়ন’। মূলত স্থানীয় স্কুলের ছাত্র এবং কয়েকজন কলেজ পড়ুয়াকে নিয়ে গড়া এই দলটির অঘোষিত নেতা ছিলেন উমেশচন্দ্র মজুমদার, যাঁকে ময়দান চিনত ‘দুখিরাম’ নামে। সাহেবদের দাম্ভিক বুটের আঘাতের মোকাবিলা করতে বাঙালি ছেলেরাও যে প্রস্তুত, সেই প্রতিবাদের স্ফুলিঙ্গ তখন ওই মাঠের কোণাতেই নীরবে দানা বাঁধছিল।

কিন্তু ১৮৮৪ সালে হঠাৎ করেই মোহনবাগান ভিলার সেই শান্ত মাঠে নেমে এল অনাকাঙ্ক্ষিত এক কালবৈশাখীর প্রমত্ত ঝড়। ফুটবলে সাহেবদের মতো বুট পায়ে খেলা উচিত নাকি বাঙালির চিরপরিচিত খালি পায়ে—এই নীতিগত প্রশ্নকে কেন্দ্র করে দুখিরাম মজুমদারের সাথে ভিলার অন্যান্য খেলোয়াড়দের তীব্র মতবিরোধ দেখা দেয়।
দুখিরাম ছিলেন দূরদর্শী। তিনি যুক্তি দিয়েছিলেন, ইংরেজদের সাথে সমানে সমানে লড়তে গেলে তাদেরই অস্ত্র, অর্থাৎ পায়ে চামড়ার ভারী বুট নিতান্তই আবশ্যক। কিন্তু ভিলার অধিকাংশ ছেলেরা খালি পায়েই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করত, তাছাড়া সেই যুগে বুট কিনে খেলার মতো আর্থিক সামর্থ্যও অনেকের ছিল না। মতের এই অমিল চরমে পৌঁছায়। ক্ষুব্ধ দুখিরাম শেষ পর্যন্ত স্টুডেন্টস ইউনিয়ন ছেড়ে বেরিয়ে যান এবং শ্যামপুকুরে মহারাজা দুর্গা চরণ লাহার তেলিপাড়া মাঠে গিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন ‘এরিয়ান্স এফসি’ (Aryans FC)। অন্যদিকে, আরও কিছু খেলোয়াড় শ্যাম স্কোয়ারে গিয়ে তৈরি করেন ‘বাগবাজার ক্লাব’ (যাদের পৃষ্ঠপোষক ছিল বাগবাজারের সেন পরিবার)।

দুখিরামের এই দলত্যাগের ফলে ভিলার যে অদম্য ছেলেরা নিজেদের মাটি কামড়ে পড়ে রইল, তারা হঠাৎ করেই হয়ে পড়ল সম্পূর্ণ একা, ক্লাবহীন এবং অভিভাবকহীন। তাদের না রইল কোনো নির্দিষ্ট নাম, না রইল অন্যান্য শক্তিশালী দলের সাথে প্রতিযোগিতায় নামার মতো কোনো সুনির্দিষ্ট মঞ্চ। কিন্তু সেই তরুণদের চোখে যে ফুটবল খেলার নেশা আর ব্রিটিশদের হারানোর এক সুপ্ত আগুন জ্বলছিল, তা নিভে যেতে দেয়নি উত্তর কলকাতার তিনটি অভিজাত ও বিদ্যানুরাগী পরিবার—বসু, মিত্র এবং সেন পরিবার।
অবশেষে এল সেই ঐতিহাসিক দিন। ১৫ই আগস্ট, ১৮৮৯ সাল। কলকাতার আকাশে তখন শ্রাবণের মেঘভারানত রূপ। সেই বৃষ্টিভেজা বিকেলে ১৪ নং বলরাম ঘোষ স্ট্রিটে বসু পরিবারের বাসভবনে এক অতি গুরুত্বপূর্ণ সভার আয়োজন করা হয়। ঘড়ির কাঁটা এগোচ্ছে, আর ঘরের ভেতর চলছে গভীর ও সুদীর্ঘ আলোচনা। তিনটি অভিজাত পরিবারের উপস্থিতিতে, বাংলার যুবসমাজের মধ্যে খেলাধুলার প্রসার ঘটানোর এক পবিত্র উদ্দেশ্য নিয়ে জন্ম নিল এক নতুন ফুটবল ক্লাব। যে ভিলার মাঠে ছেলেরা খেলত, তার প্রতি সম্মান জানিয়ে এবং স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা রেখে ক্লাবের নামকরণ করা হলো— ‘মোহনবাগান স্পোর্টিং ক্লাব’ (Mohun Bagan Sporting Club)।

ঐতিহাসিক ১৫ই আগস্ট ১৮৮৯ সালে ক্লাবের আত্মপ্রকাশের পর, প্রথম সভাপতি (President) হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করলেন বিশিষ্ট আইনজীবী এবং পরবর্তীতে জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি ভূপেন্দ্রনাথ বসু । অন্যদিকে প্রথম সেক্রেটারি হিসেবে নির্বাচিত হলেন জ্যোতীন্দ্রনাথ বসু

নতুন ক্লাব তৈরি হওয়ার পর এবার মাঠে নিজেদের প্রমাণ করার পালা। মোহনবাগান ক্লাবের প্রথম ম্যাচটি আয়োজিত হয় ইডেন হিন্দু হোস্টেলের (Eden Hindu Hostel) ছাত্রদের বিরুদ্ধে। সেই দিনটিতে কলকাতার বুকে খুব জাঁকজমকপূর্ণ কোনো আয়োজন ছিল না ঠিকই, কিন্তু একদল বাঙালি তরুণের চোখে ছিল আকাশছোঁয়া স্পর্ধা আর বুকে ছিল ইতিহাস গড়ার অদম্য জেদ। ইডেন হিন্দু হোস্টেলের ছাত্রদের বিরুদ্ধে নিজেদের প্রথম ঐতিহাসিক ম্যাচের জন্য মোহনবাগান যে দল বা লাইন-আপ (Lineup) তৈরি করেছিল, তা ভারতীয় ফুটবলের ইতিহাসের প্রথম পাতায় চিরস্মরণীয় হয়ে আছে।
দলের অধিনায়কত্বের গুরুভার তুলে দেওয়া হয়েছিল মণিলাল সেনের কাঁধে । তাঁর নেতৃত্বে প্রথম দিন মোহনবাগানের হয়ে যাঁরা মাঠে নেমেছিলেন, সেই খেলোয়াড়রা হলেন:মণিলাল সেন (অধিনায়ক), গিরীন বসু, প্রমথনাথ চট্টোপাধ্যায়, শচীন বন্দ্যোপাধ্যায়, রাম গোস্বামী, শরৎ মিত্র, হেমনাথ সেন, নলীন বসু, উপেন ঘোষ, মণীন্দ্রনাথ বসু, মনোমোহন পাণ্ডে, প্রভাস মিত্র

খালি পায়ের এই আনকোরা তরুণ দলটি সেদিন তাদের প্রথম ম্যাচে ইডেন হিন্দু হোস্টেলের ছাত্রদের বিরুদ্ধে প্রবল উদ্যমে লড়াই করেও শেষ পর্যন্ত ১-০ গোলে পরাজিত হয়। কিন্তু এই হার কোনো সমাপ্তি ছিল না, বরং এটি ছিল এক মহাকাব্যিক যাত্রার পূর্বাভাস। সেদিন পরাজয় সত্ত্বেও, মণিলাল সেনের নেতৃত্বে মোহনবাগানের এই তরুণ খেলোয়াড়দের হার না মানা মানসিকতা কলকাতার বুকে যে অদম্য জেদ আর ফুটবলের প্রতি নিঃস্বার্থ ভালোবাসার জন্ম দিয়েছিল, তা অচিরেই পরাধীন ভারতের ইতিহাসে এক নতুন ও গৌরবময় অধ্যায়ের সূচনা করে।
ঠিক এক বছর পর, ১৮৯০ সালে ক্লাবের প্রথম বার্ষিকী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে আমন্ত্রিত হয়ে এলেন প্রেসিডেন্সি কলেজের স্বনামধন্য অধ্যাপক এফ. জে. রো (F. J. Rowe)। তিনি অত্যন্ত বিস্মিত হয়ে লক্ষ্য করলেন, এই ক্লাবে বন্দুক চালনা (rifle shooting) বা ছিপ দিয়ে মাছ ধরার (angling) মতো কোনো ‘স্পোর্টিং’ (Sporting) বা অ-অ্যাথলেটিক কার্যকলাপ তো হয় না, ছেলেরা কেবল ফুটবল বা অ্যাথলেটিক্সে মগ্ন! । তাই তিনি পরামর্শ দিলেন ক্লাবের অ্যাথলেটিক্স কার্যকলাপকে মান্যতা দিয়ে ক্লাবের নামের মধ্যে ‘স্পোর্টিং’ শব্দের পরিবর্তে ‘অ্যাথলেটিক’ শব্দটি যথোপযুক্ত হবে। তাঁর এই যৌক্তিক পরামর্শকে সসম্মানে গ্রহণ করে তৎক্ষণাৎ ‘স্পোর্টিং’ শব্দটি বাদ দেওয়া হয় এবং ক্লাবের নতুন নামকরণ হয়— ‘মোহনবাগান অ্যাথলেটিক ক্লাব’ (Mohun Bagan Athletic Club)।
এই সময় কীর্তিচন্দ্র মিত্রের উত্তরাধিকারী প্রিয়নাথ মিত্র ক্লাবের খেলোয়াড়দের জন্য এক অনন্য পরিচয়ের ব্যবস্থা করেন। তিনি ওল্ড কোর্ট হাউস স্ট্রিটের বিখ্যাত ইউরোপীয় দর্জির দোকান মেসার্স র্যাঙ্কিন (Messrs Rankin) থেকে মোহনবাগানের খেলোয়াড়দের জন্য তৈরি করিয়ে আনেন সেই ঐতিহাসিক সবুজ-মেরুন (Green-Maroon) রঙের জার্সি।ক্লাবের শুরুর দিকের লোগোটি কিন্তু আজকের মতো ছিল না। মোহনবাগানের একদম প্রাথমিক লোগোতে ঘন জঙ্গলের মাঝে বা একটি তাল গাছের নিচে বসে থাকা একটি রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের (Royal Bengal tiger) ছবি ছিল, যা বাংলার বিখ্যাত ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হতো। সবচেয়ে বিস্ময়কর তথ্য হলো, ১৯১১ সালের সেই ঐতিহাসিক আই.এফ.এ শিল্ড (IFA Shield) জয়ের মহাকাব্যিক ম্যাচেও মোহনবাগানের লোগো হিসেবে এই বাঘ এবং তাল গাছের ছবিটিই ব্যবহৃত হয়েছিল ।

প্রতিষ্ঠার প্রথম দিন থেকেই মোহনবাগান অ্যাথলেটিক ক্লাব কেবল প্রতিযোগিতামূলক ফুটবল খেলা বা শারীরিক দক্ষতার দিকেই নজর দেয়নি; বরং খেলোয়াড়দের চরিত্র গঠন এবং তাদের মধ্যে নিখুঁত নৈতিক ও সামাজিক মূল্যবোধ গেঁথে দেওয়ার ওপর ক্লাব পরিচালন সমিতি সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করেছিল।
খেলোয়াড়রা যাতে সুশিক্ষিত ও আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠে, তা নিশ্চিত করতে ক্লাবে অত্যন্ত কড়া শৃঙ্খলা ও নিয়মকানুন বজায় রাখা হতো। এই কঠোর নিয়মের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য এবং ব্যতিক্রমী শর্তটি ছিল পড়াশোনা সংক্রান্ত কোনো খেলোয়াড় যদি তার স্কুল বা কলেজের পরীক্ষায় অকৃতকার্য (ফেল) হতো, তবে তাকে মোহনবাগানের হয়ে মাঠে নামতে বা ফুটবল খেলতে কঠোরভাবে নিষেধ করা হতো।
পড়াশোনায় সাফল্যের ওপর জোর দেওয়ার পাশাপাশি, ক্লাবের পবিত্রতা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য ক্লাবের তাঁবুর ভেতরে ধূমপান এবং মদ্যপান করাও সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ছিল। শৃঙ্খলার প্রতি এই সর্বাঙ্গীণ ও আপোসহীন দৃষ্টিভঙ্গিই সেদিন নিশ্চিত করেছিল যে, সবুজ-মেরুন জার্সি গায়ে যারা ময়দানে লড়তে নামছেন, তারা কেবল ফুটবল মাঠের দক্ষ খেলোয়াড়ই নন, বরং ব্যক্তিগত ও শিক্ষাজীবনেও এক একজন অত্যন্ত আদর্শ, শিক্ষিত ও সুশৃঙ্খল মানুষ।
১৮৯১ সালে মোহনবাগান ভিলা ভেঙে ফেলার কারণে ক্লাবটি তাদের সেই জন্মভূমির চেনা মাঠটি হারায়। শুরু হয় এক কঠিন যাযাবর জীবন। কিন্তু কোনো বাধাই তাদের দমিয়ে রাখতে পারেনি। প্রথমে শ্যামপুকুরের মহারাজা দুর্গা চরণ লাহার সহায়তায় ক্লাবটি তার আবাসিক এস্টেটের মাঠে তাদের খেলা স্থানান্তরিত করে, যা বর্তমানে লাহা কলোনি নামে পরিচিত। পরবর্তীতে, কলকাতা মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশনের তৎকালীন চেয়ারম্যান হেনরি লির সাহায্যে ক্লাবটি বাগবাজার এলাকার শ্যাম স্কোয়ারে তাদের মাঠ স্থানান্তরিত করে । অবশেষে ১৯০০ সালে, মোহনবাগান ক্লাব প্রেসিডেন্সি কলেজের সাথে একটি অংশীদারিত্ব তৈরি করে এবং কলকাতার ময়দানে তাদের ফুটবল মাঠ ভাগ করে নিতে শুরু করে, যেখানে তারা পরবর্তী ১৫ বছর ধরে খেলা চালিয়ে যায় ।

১৮৯৩ সালে তারা প্রথম ‘কোচবিহার কাপ’-এ অংশ নেয় এবং ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান আর্মির দলগুলোর মুখোমুখি হয়। কিন্তু শুরুর দিকের বছরগুলোতে ব্রিটিশ বা অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান দলগুলোর পেশিশক্তির কাছে বারবার হার মানতে হচ্ছিল মোহনবাগানকে।

ঠিক সেই সময়েই, নতুন শতাব্দীর শুরুতে (১৯০০ সালে), ক্লাবের সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করলেন এক লৌহকঠিন ব্যক্তিত্ব—শৈলেন্দ্রনাথ বসু (শৈলেন বাবু)। তিনি ছিলেন ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান আর্মির একজন ‘সুবেদার-মেজর’। সেনাবাহিনীর লোক হওয়ায় শ্বেতাঙ্গ সাহেবদের মানসিকতা, তাদের পেশিশক্তি এবং ব্রিটিশদের সামরিক শৃঙ্খলার সাথে তিনি ছিলেন খুব ভালোভাবেই পরিচিত। এছাড়া, এই সময়েই তিনি উদ্যোগ নিয়ে ময়দানে (Maidan) মোহনবাগানের নিজস্ব তাঁবু (Club Tent) স্থাপনের ব্যবস্থা করেন, যার ফলে ক্লাবের যাযাবর জীবনের অবসান ঘটে।
শৈলেন বাবু খুব দ্রুতই বুঝতে পেরেছিলেন যে, সাহেবদের হারাতে গেলে কেবল মাঠের বাইরের জাতীয়তাবাদের জিগির বা আবেগের আস্ফালন যথেষ্ট নয়। ব্রিটিশ রেজিমেন্টগুলোর দানবীয় শারীরিক শক্তির মোকাবিলা করতে গেলে প্রয়োজন নিখুঁত কৌশল এবং ইস্পাতকঠিন ফিটনেস। তাঁর কড়া এবং আপোসহীন নজরদারিতে মোহনবাগান তাঁবুতে শুরু হলো এক আমূল পরিবর্তন। তিনি খেলোয়াড়দের জন্য ইউরোপীয় খেলার ধরণ এবং সামরিক বাহিনীর মতো কঠোর শারীরিক কসরতের রুটিন চালু করলেন।
তিনি দলে আমদানি করলেন ক্ল্যাসিক ২-৩-৫ (2-3-5 Pyramid) ফরমেশন—যেখানে দুজন ফুল-ব্যাক, তিনজন হাফ-ব্যাক এবং পাঁচজন ফরোয়ার্ড থাকত। এই ছকের মূল উদ্দেশ্য ছিল ব্রিটিশদের লম্বা পাসের ফুটবলকে অকেজো করে দিয়ে নিজেদের মধ্যে ছোট ছোট পাসের (short-passing) জাদুকরী ফুটবল খেলা।

শৈলেন বসুর সবচেয়ে বড় অবদান ছিল খেলোয়াড়দের মানসিকতার পরিবর্তন (change in mindset)। সেই সময় চামড়ার হাতে সেলাই করা বুট কেনা সাধারণ ভারতীয়দের সামর্থ্যের বাইরে ছিল।
এভাবেই, একসময় বুট পরা নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে যে নতুন দলের জন্ম হয়েছিল, সেই দলটিতেই শৈলেন বসুর হাড়ভাঙা সামরিক অনুশীলন, ছোট ছোট পাসের জাদুকরী ‘খালি পায়ের’ রণকৌশল এক অদ্ভুত ভারসাম্য তৈরি করল। মোহনবাগান তখন আর কেবল বিনোদনের জন্য তৈরি একটি সাধারণ স্পোর্টিং বা অ্যাথলেটিক ক্লাব নেই; তারা পরিণত হয়েছে এক দুর্ধর্ষ, যুদ্ধংদেহী ইউনিটে। তারা হয়ে উঠেছে ভারতীয় জাতীয়তাবাদের এক জ্বলন্ত প্রতীক, যারা শ্বেতাঙ্গ প্রভুদের চোখে চোখ রেখে লড়াই করার জন্য নিজেদের নীরবে প্রস্তুত করছিল। ময়দানের সবুজ ঘাসে তখন বোনা হয়ে গেছে এক মহাকাব্যের বীজ, আর ব্রিটিশ সাম্রাজ্য তখনও ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি যে, এই খালি পায়ের তরুণেরাই একদিন তাদের ঔপনিবেশিক অহংকারের দুর্গ চিরতরে ধুলিস্যাৎ করে দেবে।
ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দশক। গঙ্গার বুক চিরে বয়ে আসা আর্দ্র, স্যাঁতসেঁতে হাওয়ায় তখন কেবল দূরদেশ থেকে আসা মশলার গন্ধ নয়, বরং তার রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে আছে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের চরম আস্ফালন আর গগনচুম্বী ঔদ্ধত্য। কলকাতা তখন নিছকই ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী নয়; এটি শ্বেতাঙ্গ প্রভুদের রাজকীয় আভিজাত্য, বিলাসবহুল বিনোদন এবং দুশো বছরের ঔপনিবেশিক দম্ভের এক দুর্ভেদ্য দুর্গ। ঠিক সেই যুগসন্ধিক্ষণে, ১৮৯৩ সালে, ভারতের বুকে জন্ম নিল বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন, অভিজাত এবং মর্যাদাপূর্ণ ফুটবল টুর্নামেন্ট—’আই.এফ.এ শিল্ড’ (IFA Shield)।

আই.এফ.এ শিল্ড নিছকই কোনো সাধারণ রূপোলি ট্রফি ছিল না; এটি ছিল শাসক ইংরেজদের রাজকীয় আভিজাত্য, শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ব এবং অজেয় শারীরিক শক্তির এক চূড়ান্ত, জ্বলন্ত প্রতীক। সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ শাসকেরা গভীরভাবে বিশ্বাস করত যে, ফুটবল বা রাগবির মতো উদ্দাম খেলাগুলো কেবল অবসরযাপনের বা বিনোদনের মাধ্যম হতে পারে না। তাদের চোখে এগুলো হলো ‘স্কুলবয়-স্পোর্টসম্যান-সোলজার’ (schoolboy-sportsman-soldier) বা আদর্শ, অনুগত সৈনিক গড়ার এক প্রধান কারখানাস্বরূপ। এই মহার্ঘ্য ট্রফিটির নিখুঁত নকশা তৈরি করার দায়িত্ব পেয়েছিল কলকাতার বিখ্যাত ‘ওয়াল্টার লক অ্যান্ড কোং’ (Walter Locke & Co.), আর সুদূর লন্ডনের ‘মেসার্স এলকিংটন অ্যান্ড কোং’ (Messrs Elkington & Co.)-এর নিপুণ কারিগরদের হাতে তৈরি হয়ে এই রূপোলি শিল্ড ভারতের মাটিতে এসে পৌঁছায়।

তৎকালীন ব্রিটিশ শিক্ষাবিদ ও প্রশাসকদের সুদৃঢ় অভিমত ছিল যে, এই খেলাগুলো যুবকদের শিরায় শিরায় এমন এক ইস্পাতকঠিন শারীরিক শৃঙ্খলা, অকুতোভয় সাহস এবং দুর্ধর্ষ নেতৃত্বের গুণাবলী তৈরি করে, যা বিশ্বের আনাচে-কানাচে ব্রিটিশ উপনিবেশের শাসনদণ্ড মজবুত রাখার জন্য একান্ত প্রয়োজনীয়।
ব্রিটিশ ভারতে আই.এফ.এ শিল্ডের গুরুত্ব কেবল একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। সাম্রাজ্যবাদী ইংরেজ শাসকেরা গভীরভাবে বিশ্বাস করত যে, ফুটবল বা রাগবির মতো দলগত খেলাগুলো কেবল শারীরিক বিনোদন নয়; এগুলো হলো তাদের ‘স্কুলবয়-স্পোর্টসম্যান-সোলজার’ (schoolboy-sportsman-soldier) বা আদর্শ সৈনিক গড়ার প্রধান কারখানাস্বরূপ। ব্রিটিশ শিক্ষাবিদ ও প্রশাসকদের মতে, এই খেলাগুলো যুবকদের মধ্যে এমন এক ইস্পাতকঠিন শৃঙ্খলা, সাহস এবং নেতৃত্বের গুণাবলী তৈরি করে, যা উপনিবেশ শাসন করার জন্য একান্ত প্রয়োজনীয়।
এর ঠিক বিপরীতে ছিল ভারতীয়দের, বিশেষ করে বাঙালিদের প্রতি শাসকশ্রেণীর চরম তাচ্ছিল্য, ব্যঙ্গ ও অবজ্ঞা। ব্রিটিশদের দাম্ভিক চোখে বাঙালিরা ছিল শারীরিকভাবে অত্যন্ত দুর্বল, ‘অসামরিক’ (non-martial) এবং জন্মগতভাবে মেয়েলি (effeminate) স্বভাবের এক জাতি—যাদের জন্মই হয়েছে কেবল বাবুগিরি আর শ্বেতাঙ্গ প্রভুদের বিনাবাক্যব্যয়ে দাসত্ব করার জন্য। টমাস ব্যাবিংটন মেকলে বাঙালিদের ‘মেয়েলি’ বলে প্রকাশ্য উপহাস করতেন, আর জি. ডব্লিউ. স্টিভেন্সের মতো ঔদ্ধত্যপূর্ণ সাংবাদিকরা কলম ধরতেন এই বলে যে, “বাঙালির পা হলো আদ্যোপান্ত একজন দাসের পা।”
আই.এফ.এ শিল্ডের সবুজ, বিস্তৃত ময়দান দেখতে দেখতে হয়ে উঠল সেই শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের এক নির্মম, উন্মুক্ত যুদ্ধক্ষেত্র, যেখানে পেশিবহুল, দীর্ঘকায় ব্রিটিশ সামরিক রেজিমেন্টগুলো তাদের দানবীয় চেহারা আর ভারী চামড়ার বুটের দাপটে একাধিপত্য বিস্তার করতে শুরু করল।

কিন্তু ব্রিটিশরা যখন ময়দানে নিজেদের অজেয় বলে আস্ফালন করছে, ঠিক সেই সময়েই মোহনবাগান নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার এক মরণপণ, কঠিন লড়াইয়ে অবতীর্ণ। সুবেদার-মেজর শৈলেন বসুর হাড়ভাঙা, কঠোর সামরিক প্রশিক্ষণে মোহনবাগান ১৯০৪ সালে প্রথমবার কোচবিহার কাপ জয় করে নিজেদের সুপ্ত প্রতিভার জাত চেনায়। কিন্তু জয়ের এই রূপোলি আনন্দ দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।

ঠিক সেই সময়েই মোহনবাগান তাঁবুতে ঘনীভূত হয়ে আসে এক গভীর, অন্ধকার অমানিশা—ক্লাবের প্রধান পৃষ্ঠপোষক এবং প্রাণপুরুষ মহারাজা দুর্গা চরণ লাহার আকস্মিক প্রয়াণ। এই দুর্গা চরণ লাহা ছিলেন সেই মহামানব, যিনি ১৮৯১ সালে মোহনবাগান ভিলা নির্মমভাবে ভেঙে ফেলার পর শ্যামপুকুরে নিজের আবাসিক এস্টেটের মাঠে (লাহা কলোনি) যাযাবর, ছন্নছাড়া মোহনবাগানকে পরম মমতায় আশ্রয় দিয়েছিলেন।
তাঁর আকস্মিক মৃত্যুতে মোহনবাগান এক চরম আর্থিক ও অস্তিত্বের সংকটের অতল গহ্বরে নিক্ষিপ্ত হয়। যে বিশাল বটবৃক্ষের স্নিগ্ধ ছায়ায় তারা এতদিন মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে ছিল, তা হঠাৎ করেই শিকড়শুদ্ধ উপড়ে যায়। ক্লাবের ভবিষ্যৎ তখন এক গভীর, দমবন্ধ করা অনিশ্চয়তার সুতোয় ঝুলছে।
ক্লাবকে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচাতে কর্মকর্তারা এবার মরিয়া হয়ে কোচবিহারের রাজপরিবারের দ্বারস্থ হন এবং মহারাজাকে ক্লাবের নতুন প্রধান পৃষ্ঠপোষক হওয়ার জন্য আকুল আবেদন জানান। কিন্তু মহারাজা এক অত্যন্ত কঠিন ও চ্যালেঞ্জিং শর্ত ছুঁড়ে দেন—যদি মোহনবাগান পরের বছর, অর্থাৎ ১৯০৫ সালেও কোচবিহার কাপ জয় করে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব ও ধারাবাহিকতা প্রমাণ করতে পারে, তবেই তিনি এই গুরুদায়িত্ব গ্রহণ করবেন।

খালি পায়ের বাঙালি যুবকদের কাছে এটি ছিল আক্ষরিক অর্থেই এক ‘ডু-অর-ডাই’ (Do-or-Die) পরিস্থিতি। একদিকে ব্রিটিশদের সীমাহীন দম্ভ, অন্যদিকে নিজেদের প্রাণের ক্লাবকে বাঁচানোর তীব্র উন্মাদনা। এই প্রবল, স্নায়ুক্ষয়ী মানসিক চাপের মুখে পাহাড়ের মতো অবিচল দাঁড়িয়ে ১৯০৫ সালে মোহনবাগান এক অবিশ্বাস্য, জাদুকরী ফুটবল খেলে টানা দ্বিতীয়বারের জন্য কোচবিহার কাপ ছিনিয়ে আনে এবং কোচবিহারের মহারাজাকে নিজেদের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে সসম্মানে লাভ করে।
তবে ফুটবলের আসল মহাকাব্যটি লেখা হলো ওই একই বছরে। চুঁচুড়ার মাঠে গ্ল্যাডস্টোন কাপের (Gladstone Cup) হাইভোল্টেজ ফাইনালে মোহনবাগানের মুখোমুখি হলো আই.এফ.এ শিল্ডের তৎকালীন ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন এবং সাহেবদের দুর্ধর্ষ, অজেয় দল—ডালহৌসি অ্যাথলেটিক ক্লাব (Dalhousie AC)। ময়দানের শ্বেতাঙ্গ সাহেবরা তাচ্ছিল্যের হাসিতে ধরে নিয়েছিল যে ব্রিটিশদের বুটের নির্মম আঘাতের কাছে খড়কুটোর মতো উড়ে যাবে বাঙালিরা। কিন্তু সেদিন ইতিহাস অন্য কিছু ভেবে রেখেছিল। জাদুকর স্ট্রাইকার শিবদাস ভাদুড়ীর একার চারটি জাদুকরী, অবিশ্বাস্য গোলের সুবাদে মোহনবাগান ডালহৌসিকে ৬-১ গোলের এক বিশাল ও চরম অপমানজনক ব্যবধানে চূর্ণ করে গোটা বাংলাকে স্তব্ধ ও শিহরিত করে দিল।

এই অভাবনীয় জয়ের পর মোহনবাগানের বিজয়রথ আর কোনো বাধাই মানেনি। ১৯০৬ সালে ক্যালকাটা এফসি-কে ধুলিস্যাৎ করে তারা মিন্টো ফোর্ট (Minto Fort) টুর্নামেন্ট জয় করে। কিন্তু ঠিক যখন তারা আই.এফ.এ শিল্ডের স্বপ্নের দরজায় কড়া নাড়ছে, তখন ১৯০৬ সালেই আকাশ থেকে নেমে আসে এক অনাকাঙ্ক্ষিত, হতাশাজনক বাধা। পি.কে. বিশ্বাস নামক এক খেলোয়াড় একই বছরে ন্যাশনাল ক্লাব এবং মোহনবাগান—উভয় দলের হয়েই মাঠে নেমেছিলেন, যা ইন্ডিয়ান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের (IFA) কড়া নিয়মে সম্পূর্ণ অবৈধ ছিল। এই সামান্য অজুহাতে মোহনবাগানকে ১৯০৬ সালের আই.এফ.এ শিল্ড থেকে নির্মমভাবে অযোগ্য (disqualified) ঘোষণা করা হয়।
কিন্তু এই বঞ্চনা আর অপমান তাদের আগুনকে নেভাতে পারেনি, বরং দাবানলের মতো ছড়িয়ে দিয়েছিল। ১৯০৬ থেকে ১৯০৯ সাল পর্যন্ত টানা চারবার মর্যাদাপূর্ণ ট্রেডস কাপ (Trades Cup) জয় করে তারা ময়দানকে বুঝিয়ে দেয় যে তারা অজেয়। খালি পায়ের বাঙালিদের এই ধারাবাহিক স্পর্ধা, দুরন্ত গতি আর অদম্য উত্থানকে ব্রিটিশ ক্রীড়া প্রশাসকরা আর কিছুতেই ধামাচাপা দিতে বা উপেক্ষা করতে পারল না। অবশেষে ১৯০৯ সালে, ভারতীয় ফুটবলের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী, সোনালি মুহূর্ত এল; মোহনবাগানকে প্রথমবারের মতো রাজকীয় আই.এফ.এ শিল্ডে অংশগ্রহণের আমন্ত্রণ জানানো হলো। পরাধীন, শৃঙ্খলিত এক জাতির কাছে এ যেন ছিল শ্বেতাঙ্গ প্রভুদের দুর্ভেদ্য রাজদরবারে প্রবেশের এক পরম, মহার্ঘ্য স্বীকৃতি।

শিল্ডের ঝলমলে মঞ্চে পদার্পণ করাটা গৌরবের হলেও, সেই রণাঙ্গন যে কতটা রুক্ষ, নির্মম আর রক্তক্ষয়ী হতে পারে, তা মোহনবাগানের তরুণরা খুব দ্রুতই হাড়ে হাড়ে টের পেল। ১৯০৯ সালে নিজেদের প্রথম শিল্ডের লড়াইয়ে ওয়াই.এম.সি.এ-কে (YMCA) হারালেও, ঠিক পরের রাউন্ডেই গর্ডন হাইল্যান্ডার্সের (Gordon Highlanders) মতো দুর্ধর্ষ, দানবীয় ব্রিটিশ রেজিমেন্টের মুখোমুখি হয়ে তাদের এক চরম ও ভয়ংকর বাস্তবতার সম্মুখীন হতে হলো। ১৯১০ সালের শিল্ডেও এই একই রক্তাক্ত ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে।

ময়দানে তখন এক অসম যুদ্ধ। একদিকে পেশিবহুল, দীর্ঘকায় পেশাদার ব্রিটিশ সেনা, যাদের পায়ে লোহার স্টাড দেওয়া সামরিক চামড়ার ভারী বুট; অন্যদিকে ছিপছিপে চেহারার, সম্পূর্ণ খালি পায়ের বাঙালি যুবক। ব্রিটিশদের বুটের নির্মম আঘাত, প্রাণঘাতী ট্যাকেল এবং প্রবল শারীরিক শক্তির কাছে বারবার মাথা নত করতে বাধ্য হলো মোহনবাগান। পায়ের পাতায় গভীর ক্ষত, রক্ত আর চরম হতাশা নিয়ে টানা দু’বছর শিল্ডের মঞ্চ থেকে সম্পূর্ণ শূন্য হাতে, অপমানিত হয়ে বিদায় নিতে হলো তাদের।
কিন্তু হার মানা যাদের রক্তে নেই, তারা চোখের জল মুছে ফিরে আসার নতুন, আরও ধারালো ছক কষতে শুরু করল। ক্লাব সেক্রেটারি শৈলেন বসু এবং জাদুকর অধিনায়ক শিবদাস ভাদুড়ীর তীক্ষ্ণ নেতৃত্বে মোহনবাগান তাঁবুতে শুরু হলো এক নিঃশব্দ, ভয়ংকর সামরিক বিপ্লব। তারা খুব ভালো করেই বুঝতে পেরেছিলেন, কেবল আবেগের বশবর্তী হয়ে বা দেশপ্রেমের স্লোগান দিয়ে ব্রিটিশদের দানবীয় পেশিশক্তির মোকাবিলা করা যাবে না; প্রয়োজন এক নিখুঁত, ঠান্ডা মাথার রণকৌশল।
সবচেয়ে বড় মানসিকতার পরিবর্তন (mindset shift) ঘটানো হলো ‘খালি পা’ নিয়ে। বুট না থাকাকে তারা দারিদ্র্যের অভিশাপ বা দুর্বলতা হিসেবে না দেখে, সেটিকে নিজেদের সবচেয়ে বড়, সবচেয়ে ভয়ংকর মারণাস্ত্রে পরিণত করার এক মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করলেন। তারা জানতেন, বর্ষার জলে ভেজা কলকাতার ময়দানের নরম কাদামাটিতে সাহেবদের লোহার স্টাড দেওয়া ভারী বুট আঠার মতো আটকে যাবে, যার ফলে ওই অতিকায় শরীরগুলো খুব দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়বে। আর ঠিক সেই পিচ্ছিল, কর্দমাক্ত মাঠেই খালি পায়ের বাঙালি যুবকদের পায়ের অবিশ্বাস্য নিয়ন্ত্রণ (tactile ball control), শরীরের নিচু ভরকেন্দ্র (lower center of gravity) এবং বিদ্যুতের মতো অসামান্য গতি (superior acceleration) হয়ে উঠবে ব্রিটিশদের জন্য এক চরম বিভীষিকা।
রক্ষণভাগ সামলানোর জন্য সুধীর চ্যাটার্জির মতো বুক-চিতিয়ে লড়াই করা একজন বুট-পরা ডিফেন্ডার এবং আক্রমণভাগে শিবদাস ভাদুড়ীর মতো বিদ্যুৎগতির প্লে-মেকারকে নিয়ে ছকে ফেলা হলো এক অভূতপূর্ব ব্লু-প্রিন্ট।
মহারাজা দুর্গা চরণ লাহার মৃত্যুজনিত সেই গভীর অস্তিত্ব সংকট থেকে শুরু করে ১৯০৯-১৯১০ সালের সেই অপমানের চোখের জল আর রক্তাক্ত পাগুলোই আসলে ময়দানের আকাশে নীরবে ঘনীভূত করছিল এক ভয়ংকর, প্রলয়ংকরী কালবৈশাখী মেঘ। শ্বেতাঙ্গ প্রভুরা ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি যে, এই ব্যর্থতার অপমান আর যন্ত্রণার ছাই থেকেই জন্ম নিতে চলেছে ১৯১১ সালের সেই ঐতিহাসিক, মহাকাব্যিক ঝড়, যা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের দুশো বছরের ঔপনিবেশিক দম্ভ আর অহংকারের দুর্গ চিরতরে চূর্ণ করে দেওয়ার জন্য নিঃশব্দে প্রস্তুত হচ্ছিল।
১৯১১ সালের মোহনবাগানের ‘অমর একাদশ’ (Immortal XI) কেবল একটি ফুটবল দলের এগারো জন খেলোয়াড় ছিলেন না, তাঁরা ছিলেন পরাধীন ভারতবর্ষের এক একটি জীবন্ত রূপকথা, ব্রিটিশ শৃঙ্খল ভাঙার এক একটি জ্বলন্ত স্ফুলিঙ্গ। সুবেদার-মেজর শৈলেন বসুর কঠোর সামরিক শৃঙ্খলায় এবং জাদুকর অধিনায়ক শিবদাস ভাদুড়ীর ক্ষুরধার মস্তিষ্কে পরিচালিত এই দলটির প্রতিটি খেলোয়াড়ের ব্যক্তিগত জীবন, পেশা এবং খেলার ধরণ ছিল অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। কিন্তু ১৯১১ সালের আই.এফ.এ শিল্ডের (IFA Shield) সেই ঐতিহাসিক রণাঙ্গনে তাঁরা ঠিক কী করেছিলেন, কীভাবে ব্রিটিশ দম্ভকে ধুলিস্যাৎ করেছিলেন—সেই রোমাঞ্চকর ইতিহাস আজ উহ্যই থাক। সেই চূড়ান্ত যুদ্ধের গল্প বরং এক গভীর রহস্য (Suspense) হয়েই তোলা থাক ভবিষ্যতের পাতার জন্য। আজ আমরা কেবল জানব এই এগারো জন অকুতোভয় যোদ্ধার ব্যক্তিগত জীবনের নেপথ্য কাহিনী, তাঁদের নীরব সংগ্রাম এবং তাঁদের বর্ণময় চরিত্রের বিস্তৃত উপাখ্যান।
১. শিবদাস ভাদুড়ী (অধিনায়ক এবং লেফট-ইন) :
দলের মূল কান্ডারী এবং জাদুকর শিবদাস ভাদুড়ীর জন্ম ১৮৮৭ সালের ৬ই নভেম্বর অবিভক্ত বাংলার বরিশালে হলেও, তাঁর বেড়ে ওঠা এবং ফুটবলের হাতেখড়ি কলকাতার শ্যামবাজার এলাকায়। শৈশব থেকেই ফুটবলের প্রতি তাঁর ছিল এক অদম্য আকর্ষণ। শিবদাস কেবল মাঠের দক্ষ খেলোয়াড়ই ছিলেন না, ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী ও উচ্চশিক্ষিত। সেই যুগে দাঁড়িয়ে তিনি এম.এ (MA) ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন। তাঁর এই প্রখর বুদ্ধিমত্তার ছাপ পরিষ্কার পাওয়া যেত তাঁর ফুটবল কৌশলেও। পেশাগত জীবনে তিনি কোনো সাধারণ চাকরি করতেন না; তিনি ছিলেন কলকাতা ভেটেরিনারি কলেজের (Bengal Veterinary College) একজন সরকারি ‘ভেটেরিনারি ইন্সপেক্টর’। এই পদে থেকে তাঁকে ঘোড়ার গ্ল্যান্ডার্স (glanders) বা অন্যান্য পশুর জটিল রোগ নির্ণয়ের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও দায়িত্বশীল সরকারি কাজ সামলাতে হতো।

মাঠে শিবদাসের অবস্থান ছিল ‘লেফট-ইন’ বা ফরোয়ার্ড হিসেবে। বলের ওপর তাঁর নিয়ন্ত্রণ ছিল এতটাই জাদুকরী এবং তাঁর ড্রিবলিং (dribbling) করার ক্ষমতা ছিল এতটাই নিখুঁত যে, ব্রিটিশ সাহেবরা তাঁকে বলতেন “স্লিপারি শিবদাস” (Slippery Shibdas) বা “পিছল বাবু” (Pichol Babu)। তিনি জানতেন যে, শারীরিক শক্তিতে ভারী চেহারার বুট-পরা ইংরেজদের সাথে সরাসরি সংঘর্ষে যাওয়াটা চরম বোকামি। তাই তিনি ভারতীয় ফুটবলে নিয়ে এসেছিলেন ছোট ছোট পাসের (short-passing) এক অভিনব কৌশল। তিনি পুরো দলকে এমনভাবে খেলাতেন যেন এগারো জন মানুষ একটিমাত্র মস্তিষ্ক দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। দুর্ভাগ্যবশত, এই মহানায়কের জীবন খুব দীর্ঘ হয়নি। ১৯৩২ সালে মাত্র ৪৪ বছর বয়সে পুরীতে তীর্থ করতে গিয়ে তিনি ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে অকালে মৃত্যুবরণ করেন। কিন্তু ১৯১১ সালের সেই চূড়ান্ত শিল্ড টুর্নামেন্টে এই ‘পিছল বাবু’ ঠিক কী অসাধ্য সাধন করেছিলেন? কীভাবে তাঁর ক্ষিপ্রতা ব্রিটিশদের রক্ষণভাগকে তাসের ঘরের মতো ভেঙে দিয়েছিল? সেই মহাকাব্যিক গল্প আজ এক অজানা রহস্য হয়েই থাক।
২. বিজয়দাস ভাদুড়ী (লেফট-আউট)
মোহনবাগানের আক্রমণভাগের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ ছিলেন বিজয়দাস ভাদুড়ী। তিনি ছিলেন অধিনায়ক শিবদাস ভাদুড়ীর আপন বড় ভাই। ভাদুড়ী পরিবারের রক্তেই যেন মিশে ছিল ফুটবল। শিবদাস এবং বিজয়দাস ছাড়াও তাঁদের আরও তিন ভাই—তুলসীদাস, দ্বিজদাস এবং অভয়দাস মোহনবাগানের হয়ে ফুটবল খেলেছেন। তবে শিবদাস ও বিজয়দাসের যুগলবন্দী ছিল ময়দানের সবচেয়ে চর্চিত বিষয়।

খেলার মাঠে এই দুই ভাই মোহনবাগানের আক্রমণভাগের বাঁ-দিকটা (Left flank) এমনভাবে সামলাতেন যে, প্রতিপক্ষ রীতিমতো দিশেহারা হয়ে পড়ত। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, দুই ভাইয়ের চেহারার মধ্যে এক অদ্ভুত ও বিস্ময়কর মিল ছিল। এই সাদৃশ্যকে তাঁরা মাঠের ভেতরে নিজেদের সবচেয়ে বড় কৌশলগত অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতেন। তীব্র গতির খেলার মাঝে দুই ভাই যখন নিজেদের মধ্যে পজিশন বদল (position interchange) করতেন, তখন ব্রিটিশ ডিফেন্ডাররা বিভ্রান্ত হয়ে পড়ত যে তারা কাকে মার্ক করবে, শিবদাসকে নাকি বিজয়দাসকে। বিজয়দাসের বল রিসিভ করার ক্ষমতা এবং উইং দিয়ে বিদ্যুৎবেগে উঠে এসে বক্সে নিখুঁত ক্রস বাড়ানোর দক্ষতা ছিল প্রশ্নাতীত। তিনি ছিলেন দলের সেই নীরব যোদ্ধা, যিনি নিজের ভাইয়ের প্রতিটি আক্রমণাত্মক কৌশলকে নিখুঁতভাবে সমর্থন করে যেতেন। কিন্তু ১৯১১ সালের সেই ঐতিহাসিক টুর্নামেন্টের বিভিন্ন রাউন্ডে এবং বিশেষ করে ফাইনালে বিজয়দাস তাঁর এই পজিশন বদলের কৌশল দিয়ে ইংরেজদের কীভাবে বোকা বানিয়েছিলেন? তাঁর পা থেকে ঠিক কতগুলো মারণাস্ত্র ধেয়ে গিয়েছিল ব্রিটিশ গোলপোস্টের দিকে? সেই রোমাঞ্চকর উত্তর আপাতত সময়ের গর্ভেই লুকিয়ে থাক।
৩. হীরালাল মুখার্জী (গোলরক্ষক)
একটি দলের গোলরক্ষক হওয়া সবসময়ই সবচেয়ে চাপের কাজ, আর সেই দল যদি হয় পরাধীন ভারতের এমন একটি দল যাদের খেলতে হয় খালি পায়ে এবং প্রতিপক্ষ যদি হয় সামরিক বুট পরা দুর্ধর্ষ ব্রিটিশ সেনাদল—তবে সেই গোলরক্ষককে হতে হয় আক্ষরিক অর্থেই ইস্পাতকঠিন। হীরালাল মুখার্জী ছিলেন ঠিক তেমনই একজন অতিমানবিক গোলরক্ষক। মোহনবাগানের গোলপোস্টের নিচে তিনি ছিলেন এক দুর্ভেদ্য লৌহপ্রাচীর।

হীরালালের সবচেয়ে বড় গুণ ছিল তাঁর অসীম সাহস এবং নিখুঁত পজিশনিং সেন্স (positioning sense)। ব্রিটিশ ফরোয়ার্ডদের লোহার স্টাড দেওয়া ভারী চামড়ার বুটের নির্মম আঘাতের তোয়াক্কা না করে, তিনি বারবার নিজের শরীরকে ছুঁড়ে দিতেন বলের লাইনে। তাঁর ক্ষিপ্রতা এবং শূন্যে ভেসে বল আটকানোর ক্ষমতা (reflexes) ছিল সেযুগের যেকোনো ইউরোপীয় গোলরক্ষকের সমকক্ষ। হীরালাল প্রমাণ করেছিলেন যে, গোল ঠেকানোর জন্য চামড়ার গ্লাভস বা ভারী বুটের প্রয়োজন হয় না; প্রয়োজন কেবল অদম্য সাহস এবং বাজপাখির মতো তীক্ষ্ণ দৃষ্টি। যখন ইংরেজ আক্রমণভাগ গোলমুখে ঝড় তুলত, তখন হীরালাল নিজের জীবন বিপন্ন করে সেই আক্রমণ রুখে দিতেন। কিন্তু ১৯১১ সালের সেই শিল্ড টুর্নামেন্টের কর্দমাক্ত রণাঙ্গনে পেনাল্টির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে হীরালাল ঠিক কতটা ভয়ংকর রূপ ধারণ করেছিলেন? ফাইনালে ইংরেজদের একের পর এক গোলমুখী শট তিনি কীভাবে নিজের জাদুকরী হাতে রুখে দিয়েছিলেন? সেই অতিমানবিক বীরত্বের গল্প আজ না হয় এক রুদ্ধশ্বাস সাসপেন্স হয়েই থাক।
৪. ভুতি সুকুল (রাইট-ব্যাক)
মোহনবাগানের এই ‘অমর একাদশ’ দলটির দশজন খেলোয়াড়ই ছিলেন বাঙালি, কেবল একমাত্র ব্যতিক্রম ছিলেন ভুতি সুকুল। তিনি ছিলেন দলের একমাত্র অবাঙালি সদস্য, কিন্তু মোহনবাগানের সবুজ-মেরুন জার্সির প্রতি তাঁর আবেগ এবং আত্মত্যাগ কোনো অংশে কম ছিল আদি অকৃত্রিম। রক্ষণভাগে (Defense) তিনি ছিলেন এক অতন্দ্র প্রহরী।

ভুতি সুকুল শারীরিকভাবে ছিলেন অত্যন্ত শক্তিশালী এবং লড়াকু। ব্রিটিশ সামরিক রেজিমেন্টগুলোর দীর্ঘকায় এবং পেশিবহুল ফরোয়ার্ডদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে, বুক চিতিয়ে লড়াই করার জন্য তাঁর মতো একজন শক্তিশালী ডিফেন্ডারের উপস্থিতি দলের জন্য ছিল অপরিহার্য। ব্রিটিশদের শারীরিক ফুটবল (physical play) এবং নির্মম ট্যাকেলগুলোর যোগ্য জবাব তিনি নিজের শরীর দিয়েই দিতেন। খালি পায়ে হওয়া সত্ত্বেও তিনি যেভাবে বুট পরা সাহেবদের পা থেকে বল কেড়ে নিতেন, তা দেখে গ্যালারির দর্শকরা উল্লাসে ফেটে পড়ত। দলের রক্ষণভাগকে জমাট রাখতে এবং প্রতিপক্ষের আক্রমণকে পেনাল্টি বক্সের বাইরেই অকেজো করে দিতে তাঁর জুড়ি মেলা ভার ছিল। কিন্তু ১৯১১ সালের সেই শিল্ডের চরম উত্তেজনাময় ফাইনালে তাঁর সাথে ব্রিটিশ ফরোয়ার্ডদের ঠিক কী ঘটেছিল? তাঁর শরীর ছুঁয়ে বল কীভাবে নিজের গতিপথ পরিবর্তন করেছিল? সেই নাটকীয় মুহূর্তের উন্মোচন আজ এখানে হবে না।
৫. রেভারেন্ড সুধীর কুমার চ্যাটার্জি (লেফট-ব্যাক)
সুধীর কুমার চ্যাটার্জি ছিলেন এই দলের এক অনন্য এবং সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী চরিত্র। প্রথমত, তিনি ছিলেন একাদশের একমাত্র খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বী সদস্য। দ্বিতীয়ত, এবং সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, পুরো মোহনবাগান দলের দশজন খেলোয়াড় যখন সম্পূর্ণ খালি পায়ে ময়দানে নামতেন, তখন একমাত্র সুধীর বাবুই ছিলেন সেই খেলোয়াড় যিনি পায়ে চামড়ার ভারী বুট পরে মাঠে নামতেন।

তাঁর এই বুট পরার পেছনে একটি বড় কৌশলগত কারণ ছিল। সুবেদার-মেজর শৈলেন বসু খুব ভালো করেই জানতেন যে, ব্রিটিশদের আকাশপথে আসা বিপজ্জনক শটগুলো (aerial balls) এবং সাহেব ফরোয়ার্ডদের ভয়ানক ও নির্মম ট্যাকেল সামলাতে রক্ষণভাগে এমন একজন খেলোয়াড় দরকার, যে বুক চিতিয়ে ওই ভারী বুটের আঘাত সহ্য করতে পারবে। এই কারণেই সুধীর চ্যাটার্জিকে ন্যাশনাল ক্লাব থেকে মোহনবাগানে নিয়ে আসা হয়েছিল। পেশাগত জীবনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সম্মানীয় একজন ব্যক্তি। তিনি একটি ব্রিটিশ পরিচালিত কলেজের (LMS College) অধ্যাপক হিসেবে কাজ করতেন এবং পরবর্তী জীবনে উচ্চশিক্ষার জন্য সুদূর ইংল্যান্ডের কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পাড়ি দিয়েছিলেন। সুধীর বাবু কেবল একজন খেলোয়াড় ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন সত্যিকারের ভদ্রলোক (gentleman footballer)। কিন্তু ১৯১১ সালের সেই শিল্ড টুর্নামেন্টে তাঁর এই বুট-পরা পা কীভাবে ব্রিটিশদের লম্বা পাসের কৌশলকে ধ্বংস করে দিয়েছিল? রক্ষণভাগে তিনি ঠিক কতটা নির্ভরতার প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন? সেই উত্তরগুলো আপাতত গোপনই থাকুক।
৬. অভিলাষ ঘোষ (সেন্টার-ফরোয়ার্ড)
মোহনবাগানের আক্রমণভাগের একেবারে কেন্দ্রবিন্দুতে (Center-forward) অবস্থান করতেন অভিলাষ ঘোষ। তাঁকে বলা হতো দলের ‘কালো দৈত্য’ (Black Devil)। ব্রিটিশ ডিফেন্ডারদের মনে ভয় ধরিয়ে দেওয়ার জন্য তাঁর নামটাই ছিল যথেষ্ট। ছিপছিপে চেহারার বাঙালিদের সম্পর্কে ব্রিটিশদের যে ভ্রান্ত ধারণা ছিল, অভিলাষ ঘোষ তাঁর সুঠাম, বলিষ্ঠ এবং পেশিবহুল শরীর দিয়ে সেই ধারণাকে সম্পূর্ণ চূর্ণ করে দিয়েছিলেন।

শারীরিক শক্তির পাশাপাশি তাঁর ছিল অভাবনীয় শট নেওয়ার ক্ষমতা। তিনি যখন বল নিয়ে পেনাল্টি বক্সে ঢুকতেন, তখন ইংরেজ গোলরক্ষকদেরও বুক কেঁপে উঠত। তাঁর পেশিশক্তির জোরে তিনি ব্রিটিশদের কড়া ট্যাকেল অনায়াসে ভেঙে বেরিয়ে যেতে পারতেন। ফুটবলের বাইরে তাঁর কর্মজীবনও ছিল অত্যন্ত বর্ণময়। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি একজন ব্রিটিশ চা-কোম্পানির (British tea company) উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা (top executive) হিসেবে কাজ করতেন। যে ব্রিটিশদের অধীনে তিনি চাকরি করতেন, ছুটির দিনে ময়দানে নেমে সেই ব্রিটিশদেরই তিনি পায়ে পিষে দিতেন—এ এক অদ্ভুত বৈপরীত্য! কিন্তু ১৯১১ সালের শিল্ডের সেই সেমিফাইনাল এবং ফাইনালে এই ‘কালো দৈত্য’ ঠিক কতটা ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছিলেন? বিপক্ষ গোলরক্ষকদের সাথে তাঁর ঠিক কী ভয়াবহ সংঘর্ষ হয়েছিল এবং তাঁর পা থেকে বের হওয়া সেই বজ্রকঠিন শট কীভাবে ইতিহাস রচনা করেছিল? সেই ক্লাইম্যাক্স এখন উন্মোচিত হবে না।
৭. মনমোহন মুখার্জী (রাইট-হাফ)
মাঝমাঠ বা মিডফিল্ড হলো যেকোনো ফুটবল দলের হৃৎপিণ্ড। আর মোহনবাগানের সেই হৃৎপিণ্ডকে সচল রাখতেন মনমোহন মুখার্জী। হুগলি জেলার উত্তরপাড়ার বাসিন্দা মনমোহন ছিলেন দলের একজন অক্লান্ত পরিশ্রমী খেলোয়াড়। রাইট-হাফ পজিশনে খেলে তিনি একই সাথে রক্ষণভাগ এবং আক্রমণভাগের মধ্যে এক নিখুঁত যোগসূত্র স্থাপন করতেন।

পেশাগত জীবনে মনমোহন ছিলেন ব্রিটিশ সরকারের পূর্ত দপ্তরের (Public Works Department বা PWD) একজন সাধারণ কেরানি। সারাদিন ব্রিটিশ অফিসে ফাইলের স্তূপ সামলে, বিকেলের পড়ন্ত রোদে ময়দানে এসে যখন তিনি মোহনবাগানের জার্সি গায়ে চাপাতেন, তখন তিনি আর কোনো সাধারণ কেরানি থাকতেন না; তিনি হয়ে উঠতেন এক অকুতোভয় যোদ্ধা। ব্রিটিশ লম্বা পাসের ফুটবলকে অকেজো করে দিয়ে মাঝমাঠের দখল নেওয়া এবং উইঙ্গারদের উদ্দেশ্যে বল বাড়িয়ে দেওয়া ছিল তাঁর প্রধান কাজ। কিন্তু ১৯১১ সালের সেই টুর্নামেন্টে মাঝমাঠের দখল নিতে গিয়ে ব্রিটিশ সামরিক বাহিনীর খেলোয়াড়দের সাথে তাঁর ঠিক কী ধরনের স্নায়ুযুদ্ধ হয়েছিল? কীভাবে তিনি পুরো মাঠ চষে বেড়িয়েছিলেন? সেই অজানা অধ্যায়টি এখনো সাসপেন্স হিসেবেই বিরাজমান।
৮. নীলমাধব ভট্টাচার্য (লেফট-হাফ)
মাঝমাঠের বাঁ-দিকটা (Left-half) সম্পূর্ণ নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতেন শ্রীরামপুর থেকে আসা নীলমাধব ভট্টাচার্য। মনমোহন মুখার্জী এবং রাজেন সেনগুপ্তের সাথে মিলে তিনি এমন এক ত্রিভুজ (Midfield triangle) তৈরি করতেন, যা ভেদ করে ব্রিটিশদের আক্রমণ শানানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ত।

পেশাগত জীবনে নীলমাধব কাজ করতেন ‘ন্যাশনাল ব্যাংক’-এ (National Bank)। ব্যাংকের হিসেবের খাতার মতোই ময়দানে তাঁর প্রতিটি পাস এবং ট্যাকল ছিল একদম নিখুঁত এবং হিসেবি। শিবদাস ভাদুড়ী এবং বিজয়দাস ভাদুড়ীর কাছে নিচ থেকে বল জোগান দেওয়ার মূল দায়িত্বটি থাকত তাঁরই কাঁধে। খালি পায়ে নরম কাদামাটিতে তিনি যে অভাবনীয় বল কন্ট্রোল দেখাতেন, তা ইংরেজদের কাছে ছিল এক চরম বিস্ময়। দলের আক্রমণের রূপরেখা তৈরি করতে তিনি ছিলেন এক নীরব কারিগর। কিন্তু ১৯১১ সালের সেই রুদ্ধশ্বাস টুর্নামেন্টের প্রতিটি ম্যাচে এই ব্যাংকার কীভাবে ইংরেজদের সমস্ত হিসেব-নিকেশ উল্টে দিয়েছিলেন? তাঁর পা থেকে তৈরি হওয়া আক্রমণগুলো কীভাবে ব্রিটিশদের মনে ত্রাসের সঞ্চার করেছিল? এই প্রশ্নের উত্তর জানতে হলে অপেক্ষা করতে হবে।
৯. রাজেন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত (সেন্টার-হাফ)
মোহনবাগানের ২-৩-৫ (2-3-5 Pyramid) ফরমেশনের মাঝমাঠের একেবারে কেন্দ্রে (Center-half) খেলতেন রাজেন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত বা রাজেন সেনগুপ্ত। তাঁকে বলা হতো দলের ইঞ্জিন। তিনি ছিলেন এমন একজন খেলোয়াড় যাঁর কাজের কোনো শেষ ছিল না। একদিকে যেমন ব্রিটিশ সেন্টার-ফরোয়ার্ডদের ভয়ানক আক্রমণ রুখে দেওয়া তাঁর দায়িত্ব ছিল, তেমনি বল কেড়ে নিয়ে নিজেদের আক্রমণভাগের খেলোয়াড়দের দিকে নিখুঁত থ্রু-পাস (through-pass) বাড়ানোও তাঁর কাজ ছিল।

রাজেন বাবু ছিলেন একজন অত্যন্ত বুদ্ধিদীপ্ত খেলোয়াড়, যিনি প্রতিপক্ষের খেলার ধরন খুব দ্রুত পড়ে ফেলতে পারতেন। পেশাগত জীবনে তিনি পরবর্তীকালে অল ইন্ডিয়া রেডিওর (All India Radio) সাথে যুক্ত হয়েছিলেন। তাঁর ফিটনেস ছিল অভাবনীয়, তিনি পুরো ৯০ মিনিট ধরে সমান স্ট্যামিনা নিয়ে মাঠের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে বেড়াতে পারতেন। কিন্তু ১৯১১ সালের সেই টুর্নামেন্টে ব্রিটিশদের দানবীয় আক্রমণের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি কীভাবে একাই মাঝমাঠের দুর্গ সামলেছিলেন? তাঁর সেই ঐতিহাসিক প্রতিরোধ এবং ট্যাকলগুলোর বিবরণ আজ এক গোপন অধ্যায় হয়েই থাক।
১০. হাবুল সরকার (রাইট-ইন)
আক্রমণভাগের ডানদিকে (Right-in) খেলে বিপক্ষ দলের ঘুম কেড়ে নিতেন হাবুল সরকার। তাঁর খেলার মূল বৈশিষ্ট্য ছিল ক্ষিপ্রতা এবং নিখুঁত প্লেসমেন্ট। কানু রায় যখন উইং দিয়ে বল নিয়ে উঠে আসতেন, তখন হাবুল সরকার অত্যন্ত দ্রুতগতিতে পেনাল্টি বক্সের সঠিক জায়গায় পৌঁছে যেতেন।

ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন কলকাতা কর্পোরেশনের (Calcutta Corporation) একজন সাধারণ কর্মচারী। কিন্তু ময়দানে নামলে তাঁর ড্রিবলিং এবং দূরপাল্লার শট নেওয়ার ক্ষমতা তাঁকে অসাধারণ করে তুলত। দলের প্রতি তাঁর নিষ্ঠা এবং নেতৃত্বের গুণাবলী ছিল প্রশ্নাতীত। এই যোগ্যতার কারণেই ১৯১৩ সালে শিবদাস ভাদুড়ী যখন অধিনায়কত্বের পদ থেকে সরে দাঁড়ান, তখন এই হাবুল সরকারের কাঁধেই দলের নেতৃত্ব তুলে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ১৯১১ সালের সেই শ্বেতাঙ্গ বধের টুর্নামেন্টে তাঁর পা থেকে ঠিক কী ধরনের জাদু বের হয়েছিল? তাঁর কোনো এক জাদুকরী শটে কি কোনো ব্রিটিশ গোলরক্ষক পরাস্ত হয়েছিলেন? সেই মহেন্দ্রক্ষণের গল্পটি আজ সাসপেন্সের ঘেরাটোপেই আবদ্ধ থাক।
১১. জিতেন্দ্রনাথ ‘কানু’ রায় (রাইট-আউট)
পূর্ববঙ্গের ময়মনসিংহ থেকে আসা কানু রায় ছিলেন দলের রাইট-আউট বা বিদ্যুৎগতির উইঙ্গার। তাঁর গতির কাছে ব্রিটিশ দলের ভারী চেহারার ডিফেন্ডাররা বারবার পরাস্ত হতো। টাচলাইন ধরে তাঁর দৌড় ছিল দেখার মতো।

১৯১১ সালের জুলাই মাস। ভারতবর্ষের তৎকালীন রাজধানী কলকাতার বাতাসে তখন একদিকে যেমন বর্ষার স্যাঁতসেঁতে আর্দ্রতা, অন্যদিকে তেমনই মিশে আছে বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী স্বদেশী আন্দোলনের বারুদ আর পরাধীনতার গ্লানি থেকে মুক্তির এক তীব্র আকাঙ্ক্ষা। আই.এফ.এ শিল্ড তখন ব্রিটিশদের রাজকীয় আভিজাত্য এবং ‘অজেয়’ শারীরিক শক্তির এক চূড়ান্ত প্রতীক। এই টুর্নামেন্টে নেটিভ বা দেশীয় দলগুলোর অংশগ্রহণ তখনো খুব একটা সহজ বা সাধারণ বিষয় ছিল না। কিন্তু ১৯০৬ থেকে ১৯০৯ সাল পর্যন্ত টানা চারবার মর্যাদাপূর্ণ ট্রেডস কাপ (Trades Cup) এবং গ্ল্যাডস্টোন কাপের মতো প্রতিযোগিতায় অসামান্য ধারাবাহিকতা দেখানোর পর মোহনবাগান নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করেই এই রাজকীয় আসরে প্রবেশ করেছিল।
প্রথম রাউন্ড: সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ, ১০ জনের অসম লড়াই এবং ব্রিটিশ দর্পচূর্ণ (১০ জুলাই ১৯১১):১০ জুলাই, রেঞ্জার্স গ্রাউন্ডে (Rangers Ground) টুর্নামেন্টের প্রথম রাউন্ডে মোহনবাগানের মুখোমুখি হয় সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ (St. Xavier’s College)। সেন্ট জেভিয়ার্স দলটি মূলত ব্রিটিশ ছাত্র এবং পেশাদার শ্বেতাঙ্গ খেলোয়াড়দের নিয়ে গঠিত ছিল, যারা শারীরিক শক্তির পাশাপাশি ইউরোপীয় ফুটবলের ব্যাকরণে যথেষ্ট পারদর্শী ছিল। কিন্তু এই ম্যাচের আগেই ইংরেজরা তাদের চিরপরিচিত কূটকৌশল এবং নোংরা রাজনীতির আশ্রয় নেয়। মোহনবাগান দলের অন্যতম প্রধান এবং একমাত্র বুট-পরা ডিফেন্ডার ছিলেন রেভারেন্ড সুধীর কুমার চ্যাটার্জি (Rev. Sudhir Kumar Chatterjee)। তিনি সেসময় ভবানীপুরের এল.এম.এস (LMS) কলেজের একজন সম্মানীয় অধ্যাপক ছিলেন। মোহনবাগানের এই নির্ভরযোগ্য রক্ষণভাগের খেলোয়াড় যাতে শিল্ডের প্রথম ম্যাচে মাঠে নামতে না পারেন, সেই উদ্দেশ্যে সেন্ট জেভিয়ার্সের প্রতি সহানুভূতিশীল এবং ব্রিটিশ দম্ভে মত্ত এল.এম.এস কলেজের অধ্যক্ষ ম্যাগ্রেগার সাহেব সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত শত্রুতা ও আক্রোশের বশবর্তী হয়ে সুধীর চ্যাটার্জির অর্ধদিবস ছুটি অত্যন্ত অন্যায়ভাবে বাতিল করে দেন।

ক্লাব সেক্রেটারি এবং সুবেদার-মেজর শৈলেন্দ্রনাথ বসু অনেক চেষ্টা করেও ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে গিয়ে সুধীরের ছুটি মঞ্জুর করাতে পারেননি। ফলে এক চরম প্রতিকূল এবং মানসিকভাবে বিপর্যস্ত অবস্থায় মোহনবাগানকে তাদের শিল্ডের প্রথম ম্যাচটি শুরু করতে হয় মাত্র ১০ জন খেলোয়াড় নিয়ে। শ্বেতাঙ্গদের এই নির্লজ্জ পক্ষপাতিত্ব এবং কদর্য কূটকৌশল সেদিন মোহনবাগানের খালি পায়ের খেলোয়াড়দের মনোবল তো ভাঙতেই পারেনি, উল্টে তাদের ধমনীতে বইয়ে দিয়েছিল প্রতিশোধের এক তীব্র আগুন।
ম্যাচের শুরু থেকেই সেন্ট জেভিয়ার্সের ইংরেজ খেলোয়াড়রা তাদের সামরিক বুট এবং পেশিশক্তির আস্ফালন দেখিয়ে খালি পায়ের ১০ জন বাঙালিকে মাঠের মধ্যে কোণঠাসা করতে চেয়েছিল। কিন্তু মোহনবাগান সেদিন মাঠে নামিয়েছিল তাদের যুগান্তকারী ২-৩-৫ (2-3-5 Pyramid) ফরমেশন। ১০ জন খেলোয়াড় নিয়েও তারা এমন এক অভাবনীয় হাই-টেম্পো প্রেসিং (high-tempo pressing) এবং ছোট ছোট পাসের (short passing) জাদুকরী ফুটবল খেলতে শুরু করে যে, সেন্ট জেভিয়ার্সের খেলোয়াড়রা কার্যত দিশেহারা হয়ে পড়ে।
আক্রমণভাগে সেদিন জ্বলে উঠেছিলেন ভাদুড়ী ভাইয়েরা। ১৯ বছর বয়সী অতিকায় ফরোয়ার্ড ‘কালো দৈত্য’ অভিলাষ ঘোষ নিজের শারীরিক শক্তির অসামান্য প্রয়োগ ঘটিয়ে ব্রিটিশ রক্ষণভাগকে ছিন্নভিন্ন করে একটি দুর্দান্ত গোল তুলে নেন। অন্যদিকে, উইং দিয়ে বিদ্যুৎবেগে উঠে এসে মোহনবাগানের অন্যতম সেরা আক্রমণভাগের সেনাপতি বিজয়দাস ভাদুড়ী একাই পরপর দুটি জাদুকরী গোল (brace) করে সেন্ট জেভিয়ার্সের কফিনে শেষ পেরেকটি পুঁতে দেন। ৩-০ গোলের এই বিশাল এবং অপমানজনক ব্যবধানে ইংরেজদের পরাস্ত করে মোহনবাগান কেবল নিজেদের যোগ্যতাই প্রমাণ করেনি, বরং সমগ্র টুর্নামেন্টকে এবং ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে এক প্রচ্ছন্ন অশনিসংকেত দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছিল যে, এবারের লড়াইটা কেবল ফুটবলের নয়, পরাধীন জাতির আত্মমর্যাদা পুনরুদ্ধারের।
(ঐতিহাসিক তথ্যবিভ্রাট: পরবর্তীকালে কিছু পত্রপত্রিকা ও লোকমুখে প্রচলিত হয়েছিল যে এই ম্যাচেই নাকি গোলরক্ষক হীরালাল মুখার্জী পরপর তিনটি পেনাল্টি বাঁচিয়েছিলেন। কিন্তু টুর্নামেন্টের মূল আর্কাইভ এবং সমসাময়িক প্রামাণ্য নথিপত্র নিশ্চিত করে যে, হীরালালের সেই অতিমানবিক পেনাল্টি বাঁচানোর ঘটনাটি ঘটেছিল এর ঠিক পরের ম্যাচে, ক্যালকাটা রেঞ্জার্সের বিরুদ্ধে।)
দ্বিতীয় রাউন্ড: ক্যালকাটা রেঞ্জার্স, কর্দমাক্ত রণাঙ্গন এবং হীরালালের অতিমানবিক বীরত্ব (১৪ জুলাই ১৯১১)
সেন্ট জেভিয়ার্সকে দুরমুশ করার পর মোহনবাগানের আত্মবিশ্বাস তখন তুঙ্গে। কিন্তু ১৪ জুলাই, কাস্টমস গ্রাউন্ডে (Customs Ground) অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় রাউন্ডের ম্যাচটি হয়ে উঠেছিল প্রকৃতির সাথে এবং ব্রিটিশ দম্ভের সাথে এক দ্বিমুখী মরণপণ সংগ্রাম। প্রতিপক্ষ ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী শ্বেতাঙ্গ দল—ক্যালকাটা রেঞ্জার্স ক্লাব (Calcutta Rangers Club)।
সেদিন প্রকৃতিও যেন ব্রিটিশদের পক্ষ নিয়েছিল। শ্রাবণের অঝোর বারিধারায় কাস্টমস গ্রাউন্ড পরিণত হয়েছিল এক পিচ্ছিল, কর্দমাক্ত জলাভূমিতে। ব্রিটিশরা জানত, এই ভারী কাদামাঠে বুট পরা ইউরোপীয়দের গায়ের জোরের ফুটবলের সামনে খালি পায়ের বাঙালিদের টিকে থাকা প্রায় অসম্ভব। ভেজা মাঠে খালি পায়ে বলের নিয়ন্ত্রণ রাখাটাই এক চূড়ান্ত পরীক্ষা। কিন্তু খেলার শুরুতে যখন বৃষ্টির দাপট কিছুটা কমে আসে এবং মাঠ সামান্য শুকাতে শুরু করে, ঠিক সেই সুযোগটাই কাজে লাগায় মোহনবাগান। জাদুকর অধিনায়ক শিবদাস ভাদুড়ী এবং তাঁর ভাই বিজয়দাস ভাদুড়ীর জাদুকরী যুগলবন্দীতে প্রথমার্ধেই রেঞ্জার্সের রক্ষণভাগ তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে। শিবদাস ভাদুড়ী তাঁর স্বভাবসিদ্ধ ‘পিছল বাবু’ বা (Slippery Shibdas) সুলভ ড্রিবলিংয়ে ইংরেজ ডিফেন্ডারদের বোকা বানিয়ে একটি অসাধারণ গোল করেন এবং বিজয়দাস ভাদুড়ী আরও একটি গোল করে প্রথমার্ধেই মোহনবাগানকে ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে দেন। গ্যালারিতে উপস্থিত হাজার হাজার দেশীয় সমর্থকের গর্জনে তখন কাস্টমস গ্রাউন্ড কাঁপছে।

তবে দ্বিতীয়ার্ধে শুরু হলো এক চরম নাটকীয়তা এবং ব্রিটিশদের মরিয়া প্রত্যাঘাত। বৃষ্টির বেগ ফের বাড়তে থাকায় মাঠ সম্পূর্ণ কর্দমাক্ত হয়ে ওঠে। ভারী চামড়ার বুট পরা রেঞ্জার্সের ফরোয়ার্ডরা এই কাদামাঠের সম্পূর্ণ ফায়দা তুলে প্রবল শারীরিক আক্রমণ (physical play) শানাতে শুরু করে। মোহনবাগানের খালি পায়ের খেলোয়াড়দের প্রতিটি পদক্ষেপ হয়ে ওঠে প্রবল প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে এক স্নায়ুক্ষয়ী লড়াই। রেঞ্জার্সের আক্রমণের প্রবল চাপে মোহনবাগানের বক্সে বারবার বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি হতে থাকে।
খেলার গতির এই পর্যায়ে রেঞ্জার্স ক্লাব পরপর তিনটি পেনাল্টি কিক (Penalty Kicks) আদায় করে নেয়। গ্যালারিতে তখন পিনপতন স্তব্ধতা; সমর্থকদের চোখেমুখে হতাশা আর আশঙ্কার ছায়া। কিন্তু মোহনবাগানের গোলপোস্টের নিচে সেদিন পাহারায় ছিলেন হীরালাল মুখার্জী—যিনি হয়ে উঠেছিলেন এক দুর্ভেদ্য লৌহপ্রাচীর এবং ফুটবলের দেবতা। কোনো ভারী বুট বা গ্লাভস ছাড়া, সম্পূর্ণ খালি পায়ে এবং খালি হাতে হীরালাল সেদিন গোলপোস্টের সামনে যে অতিমানবিক ক্ষিপ্রতা, স্পেশিয়াল অ্যাওয়ারনেস (spatial awareness) এবং রিফ্লেক্সের (reflexes) প্রদর্শন করেছিলেন, তা ফুটবল ইতিহাসে এক বিরলতম রূপকথা। বুট পরা ব্রিটিশ খেলোয়াড়দের নেওয়া পরপর তিনটি ভয়ংকর গতির পেনাল্টি শট তিনি বাজপাখির মতো শূন্যে ভেসে এবং নিজের শরীরকে বিপন্ন করে রুখে দেন! এই অবিশ্বাস্য ঘটনার পর স্টেডিয়ামের শ্বেতাঙ্গ দর্শকরাও হতবাক হয়ে যায়। শেষদিকে রেঞ্জার্সের খেলোয়াড় অ্যালেন (Allen) একটি গোল শোধ করতে সক্ষম হলেও, হীরালালের সেই অতিমানবিক বীরত্বে ভর করে ২-১ গোলের জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে মোহনবাগান। এই জয় প্রমাণ করেছিল যে, মোহনবাগানের রক্ষণভাগ কেবল প্রতিভাবানই নয়, তারা মানসিকভাবে ইস্পাতের মতো কঠিন।
কোয়ার্টার ফাইনাল: পেশিশক্তির বিরুদ্ধে ইস্পাতকঠিন স্পর্ধা এবং রাইফেলে ব্রিগেডের পতন (১৯ জুলাই ১৯১১)
১৯ জুলাই, ডালহৌসি গ্রাউন্ডের (Dalhousie Ground) কোয়ার্টার ফাইনালে মোহনবাগানের সামনে এসে দাঁড়াল ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর অন্যতম দুর্ধর্ষ, সুশৃঙ্খল এবং ভয়ংকর দল ‘রাইফেল ব্রিগেড’ (Rifle Brigade)। এই সামরিক পদাতিক দলটি সরাসরি এবং অত্যন্ত আক্রমণাত্মক লং-পাসিং ও শারীরিক ফুটবলে (physical and direct style of play) অভ্যস্ত ছিল।
এই ম্যাচের একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক প্রেক্ষাপট ছিল। এক বছর আগেই আসামের একটি স্থানীয় প্রতিযোগিতায় এই রাইফেল ব্রিগেডের কাছেই শারীরিক শক্তির কাছে পরাস্ত হয়ে মোহনবাগানকে ১-০ গোলে হারতে হয়েছিল। ফলে ইংরেজদের চোখেমুখে সেদিন ছিল এক অসীম ঔদ্ধত্য এবং আত্মবিশ্বাস। ফোর্ট উইলিয়ামের মাঠে নিয়মিত অনুশীলন করা রাইফেল ব্রিগেডের ফরোয়ার্ড লাইনে ছিলেন প্যান্সফোর্ড (Pansford) এবং চ্যাপম্যানের (Chapman) মতো দীর্ঘকায় ও দুর্ধর্ষ ব্রিটিশ সেনাদল, যাদের ভারী সামরিক বুটের নির্মম আঘাতের সামনে খালি পায়ের বাঙালি যুবকদের দাঁড় করানোটা আক্ষরিক অর্থেই এক অসম যুদ্ধ ছিল।
কিন্তু এই ম্যাচটি ঘিরে গোটা কলকাতা শহর জুড়ে ততক্ষণে এক জাতীয়তাবাদী উন্মাদনা তৈরি হয়ে গেছে। ডালহৌসি গ্রাউন্ডে সেদিন উপস্থিত হয়েছিল প্রায় ৩৫,০০০ থেকে ৪০,০০০ এর এক বিশাল জনসমুদ্র। ধনী জমিদার থেকে শুরু করে নিম্ন-মধ্যবিত্ত সাধারণ মানুষ—সকলেই সেদিন বুঝে গিয়েছিল যে এই খেলাটি কেবল একটি স্পোর্টিং ইভেন্ট নয়, এটি ব্রিটিশ অহংকার চূর্ণ করার এক প্রকাশ্য রণাঙ্গন।

ম্যাচের শুরু থেকেই শুরু হয় এক চরম শারীরিক লড়াই। রাইফেল ব্রিগেডের বুট পরিহিত সেনারা বারবার লং বল খেলে মোহনবাগানের বক্সে আক্রমণ শানাতে থাকে। কিন্তু মোহনবাগানের রক্ষণভাগে সেদিন ভুতি সুকুল এবং সুধীর চ্যাটার্জি নিজেদের শরীরকে ঢালের মতো ব্যবহার করে ব্রিটিশ আক্রমণ রুখে দেন। আর গোলপোস্টের নিচে হীরালাল মুখার্জী সেদিন প্যান্সফোর্ড এবং চ্যাপম্যানের একের পর এক গোলমুখী শট অবিশ্বাস্য ক্ষিপ্রতায় রুখে দিয়ে ব্রিটিশদের হতাশায় ডুবিয়ে দেন।
খেলার যখন আর মাত্র ১০ মিনিট বাকি, তখনও স্কোরলাইন ০-০। গ্যালারিতে চরম উত্তেজনা। এমন সময় শুরু হলো মোহনবাগানের সেই আইকনিক ছোট পাসের (short passing) জাদুকরী সম্মিলিত আক্রমণ। শিবদাস ভাদুড়ী মাঝমাঠ থেকে বল ধরে জাদুকরী ড্রিবলিংয়ে ব্রিটিশ রক্ষণভাগকে ছিন্নভিন্ন করে বল বাড়ালেন বড় ভাই বিজয়দাসের দিকে। বিজয়দাস অত্যন্ত চতুরতার সাথে এবং অসামান্য নৈপুণ্যে রাইফেল ব্রিগেডের দুই দুর্ধর্ষ ডিফেন্ডার ম্যারেন (Maren) এবং ক্লার্কের (Clark) মাঝখান দিয়ে বিদ্যুৎবেগে বক্সে ঢুকে পড়েন। বিপদ বুঝে ইংরেজ গোলরক্ষক নটন (Notton) গোল ছেড়ে এগিয়ে আসেন, কিন্তু বিজয়দাস তাঁর নিখুঁত প্লেসমেন্ট ও বজ্রকঠিন শটে নটনকে সম্পূর্ণ পরাস্ত করে বল জালে জড়িয়ে দেন।
(ঐতিহাসিক তথ্যবিভ্রাট: যদিও কিছু নথিতে এই গোলটি শিবদাস ভাদুড়ীর বলে উল্লেখ করা হয়, তবে সমসাময়িক বিস্তারিত ম্যাচ বিবরণী এবং ইন্ডিয়ান ডেইলির রিপোর্ট অনুযায়ী এই ঐতিহাসিক গোলটি এসেছিল বিজয়দাস ভাদুড়ীর পা থেকেই।)
হাজার হাজার কণ্ঠের গগনভেদী চিৎকারে ডালহৌসি গ্রাউন্ড সেদিন কেঁপে উঠেছিল। অজেয় ব্রিটিশ সামরিক শক্তির পতন ঘটিয়ে ১-০ গোলের জয় ছিনিয়ে নিয়ে স্বপ্নের সেমিফাইনালে পদার্পণ করে খালি পায়ের একাদশ।
সেমিফাইনাল: মিডলসেক্স রেজিমেন্টের বিরুদ্ধে মহাকাব্যিক রণাঙ্গন এবং এক রুদ্ধশ্বাস প্রত্যাবর্তণ (২৪ ও ২৬ জুলাই ১৯১১)
সেমিফাইনালে মোহনবাগানের সামনে এসে দাঁড়াল টুর্নামেন্টের সবচেয়ে শারীরিক শক্তিসম্পন্ন এবং প্রবল পরাক্রমশালী ব্রিটিশ সামরিক দল—ফার্স্ট মিডলসেক্স রেজিমেন্ট (1st Middlesex Regiment)। ২৪ জুলাইয়ের এই ম্যাচের উত্তেজনা ছিল কল্পনাতীত। ডালহৌসি গ্রাউন্ডে তিল ধারণের জায়গা ছিল না, গাছের ডাল, টেলিগ্রাফের খুঁটি—সব জায়গায় মানুষ ঝুলছিল। মিডলসেক্স দলের প্রধান ভরসা ছিলেন তাদের অধিনায়ক ও গোলরক্ষক পিগট (Piggot) (মতান্তরে টিগট)। পিগট ইংল্যান্ডের পোর্টসমাউথ (Portsmouth) ক্লাবে পেশাদার ফুটবল খেলার অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ছিলেন এবং আগের মরসুমেই তিনি ৯টি পেনাল্টি বাঁচিয়ে ব্রিটিশদের হিরো হয়ে উঠেছিলেন।
অধিনায়ক শিবদাস ভাদুড়ী জানতেন যে, এই দানবীয় চেহারার ব্রিটিশদের সাথে শারীরিক সংঘর্ষে (physical collision) জড়ানোটা হবে চরম বোকামি। তাই তিনি দলকে নির্দেশ দেন ব্রিটিশদের আক্রমণ করতে দিয়ে নিজেদের রক্ষণ মজবুত রাখতে এবং সুযোগ বুঝে কাউন্টার অ্যাটাকে (counter-attack) উঠতে।

কিন্তু ২৪ জুলাইয়ের প্রথম ম্যাচে ইংরেজ রেফারিরা ব্রিটিশদের হয়ে নির্লজ্জ পক্ষপাতিত্ব শুরু করে। খেলার শুরুতেই মিডলসেক্স একটি গোল করে এগিয়ে যায়। হীরালালের অসাধারণ জোড়া সেভের (double save) পর, তৃতীয়বার যখন তিনি বলটি গোল লাইনের কাছে ধরে ফেলেন, তখন মিডলসেক্সের ফরোয়ার্ডরা হীরালালকে আক্ষরিক অর্থেই লাথি মেরে বলসহ গোলের ভেতর ঠেলে দেয়। রেফারি এই সুস্পষ্ট ফাউলটিকে উপেক্ষা করে গোলটিকে বৈধ বলে ঘোষণা করেন। এই নক্কারজনক অবিচারের মুখে দাঁড়িয়েও বাঙালি যুবকরা হার মানেনি। শিবদাস ভাদুড়ী এক অসাধারণ ট্যাকটিক্যাল চাল চালেন। তিনি কানুরায়কে রাইট-আউট থেকে লেফট-আউটে নিয়ে আসেন এবং নিজে সেন্টারে চলে যান। এই জায়গা বদলের ফলে বিভ্রান্ত ইংরেজ ডিফেন্সের ফাঁক গলে বিদ্যুৎগতির উইঙ্গার কানু রায় এক অবিশ্বাস্য গোলে মোহনবাগানকে সমতায় ফেরান (১-১)। ম্যাচটি ড্র হওয়ায় নিয়ম অনুযায়ী ২৬ জুলাই পুনরায় ‘রিপ্লে’ (Replay) ম্যাচের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
২৬ জুলাই, রিপ্লে ম্যাচ (Replay): আগের দিনের চরম পক্ষপাতিত্বের কারণে আই.এফ.এ বাধ্য হয়ে এই ম্যাচে রেফারি পরিবর্তন করে। এই ম্যাচে শিবদাস ভাদুড়ী ব্রিটিশদের নাজেহাল করার জন্য এক মাস্টারস্ট্রোক খেলেন। তিনি ২-৩-৫ ছকে মাঝমাঠের দখল নেওয়ার জন্য স্কয়ার পাস (square pass) এবং ব্যাকপাস (backpass) নির্ভর এক অত্যন্ত ধীরগতির দখলদারি ফুটবল (possession football) খেলতে শুরু করেন। নরম কাদামাটিতে বুট পরা ব্রিটিশরা এই বল তাড়া করতে করতে প্রচণ্ড ক্লান্ত ও বিরক্ত হয়ে পড়ে।
প্রথমার্ধের শেষদিকে এক ভয়ংকর দুর্ঘটনা ঘটে। শিবদাসের বাড়ানো একটি বল ধরতে ছুটে যান অতিকায় স্ট্রাইকার অভিলাষ ঘোষ। অন্যদিকে ব্রিটিশ গোলরক্ষক পিগটও বল ক্লিয়ার করতে গোল ছেড়ে বেরিয়ে আসেন। প্রবল বেগে ছুটে আসা অভিলাষকে ট্যাকেল করতে গিয়ে পিগট ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে যান এবং অভিলাষের পায়ের বুড়ো আঙুলের নখ পিগটের বাঁ চোখের ওপর মারাত্মকভাবে আঘাত করে। পিগট কিছুক্ষণের জন্য জ্ঞান হারান, কিন্তু পরে চোখে ব্যান্ডেজ বেঁধে এক চোখ ঢাকা অবস্থাতেই সাহসিকতার সাথে পুরো ম্যাচ খেলেন।

এই ঘটনার পর মিডলসেক্সের খেলোয়াড়রা ক্ষিপ্ত হয়ে মারাত্মক সব ফাউল করতে শুরু করে। কিন্তু মোহনবাগান তখন রক্তের স্বাদ পাওয়া বাঘের মতো। খেলা শেষ হওয়ার আর মাত্র ১০ মিনিট বাকি, ঠিক তখনই শিবদাস ভাদুড়ী মাঝমাঠ থেকে এক অবিশ্বাস্য দৌড় শুরু করেন। প্রায় ৫,০০০ দর্শককে মুগ্ধ করে তিনি জাদুকরী ড্রিবলিংয়ে ইংরেজ ডিফেন্স তছনছ করে বল বাড়ান বিজয়দাসের দিকে। বিজয়দাস বলটি আবার শিবদাসকে ফেরত দিলে, শিবদাস অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে বলটি পেনাল্টি বক্সে ফাঁকায় থাকা হাবুল সরকারের উদ্দেশ্যে বাড়িয়ে দেন। চলতি বলে হাবুল সরকারের সেই নিখুঁত প্লেসমেন্ট এবং গগনভেদী শট পিগটকে সম্পূর্ণ পরাস্ত করে বল জালে জড়িয়ে দেয়।
পরাস্ত করে বল জালে জড়িয়ে দেয়।
এরপর ব্রিটিশ প্রতিরোধ তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে। কিছুক্ষণ পরেই শিবদাস ভাদুড়ী একার নৈপুণ্যে এক অবিশ্বাস্য সলো রান (solo run) থেকে দলের দ্বিতীয় গোলটি করেন। এরপর মিডলসেক্সের টেন্ডেল (Tendell) কানু রায়কে মারাত্মক ফাউল করলে মোহনবাগান একটি ফ্রি-কিক পায়, যা থেকে কানু রায় দলের তৃতীয় গোলটি করে মিডলসেক্সের কফিনে শেষ পেরেকটি পুঁতে দেন।
৩-০ ব্যবধানের এই মহাকাব্যিক জয় নিশ্চিত হওয়ার সাথে সাথে ডালহৌসি গ্রাউন্ডের দর্শকরা মাঠে নেমে পড়ে। আবেগের বাঁধ ভেঙে যায়। সবুজ-মেরুন যোদ্ধাদের জড়িয়ে ধরে মানুষ কাঁদতে থাকে। এমনকি মোহনবাগানের কঠোর, লোহকঠিন শৃঙ্খলাপরায়ণ কর্মকর্তা মেজর শৈলেন বসুর চোখেও সেদিন আনন্দাশ্রু দেখা গিয়েছিল। এই জয় প্রমাণ করেছিল যে, পরাধীন ভারতের খালি পায়ের যুবকরা কেবল ফুটবলের মাঠেই নয়, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের দুশো বছরের ঔপনিবেশিক দম্ভকেও ধুলিস্যাৎ করতে সক্ষম। এই চার ম্যাচের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম আর অপমানের ছাই থেকেই জন্ম নিয়েছিল ২৯ জুলাইয়ের সেই ঐতিহাসিক ফাইনালের মঞ্চ।
এরপর ব্রিটিশ প্রতিরোধ তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে। কিছুক্ষণ পরেই শিবদাস ভাদুড়ী একার নৈপুণ্যে এক অবিশ্বাস্য সলো রান (solo run) থেকে দলের দ্বিতীয় গোলটি করেন। এরপর মিডলসেক্সের টেন্ডেল (Tendell) কানু রায়কে মারাত্মক ফাউল করলে মোহনবাগান একটি ফ্রি-কিক পায়, যা থেকে কানু রায় দলের তৃতীয় গোলটি করে মিডলসেক্সের কফিনে শেষ পেরেকটি পুঁতে দেন।
৩-০ ব্যবধানের এই মহাকাব্যিক জয় নিশ্চিত হওয়ার সাথে সাথে ডালহৌসি গ্রাউন্ডের দর্শকরা মাঠে নেমে পড়ে। আবেগের বাঁধ ভেঙে যায়। সবুজ-মেরুন যোদ্ধাদের জড়িয়ে ধরে মানুষ কাঁদতে থাকে। এমনকি মোহনবাগানের কঠোর, লোহকঠিন শৃঙ্খলাপরায়ণ কর্মকর্তা মেজর শৈলেন বসুর চোখেও সেদিন আনন্দাশ্রু দেখা গিয়েছিল। এই জয় প্রমাণ করেছিল যে, পরাধীন ভারতের খালি পায়ের যুবকরা কেবল ফুটবলের মাঠেই নয়, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের দুশো বছরের ঔপনিবেশিক দম্ভকেও ধুলিস্যাৎ করতে সক্ষম। এই চার ম্যাচের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম আর অপমানের ছাই থেকেই জন্ম নিয়েছিল ২৯ জুলাইয়ের সেই ঐতিহাসিক ফাইনালের মঞ্চ।
অবশেষে এল সেই বহু প্রতীক্ষিত, ঐতিহাসিক দিন—২৯শে জুলাই, ১৯১১। দিনটি পরাধীন ভারতবর্ষের বুকে নিছক কোনো ফুটবল ম্যাচের দিন ছিল না, বরং এটি ছিল এক শৃঙ্খলিত জাতির আত্মমর্যাদা পুনরুদ্ধারের এক চরম ও চূড়ান্ত পরীক্ষা। আই.এফ.এ শিল্ডের ফাইনালে সেদিন মুখোমুখি বাংলার দামাল ছেলেদের দল মোহনবাগান এবং ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর দুর্ধর্ষ, পেশিবহুল দল ইস্ট ইয়র্কশায়ার রেজিমেন্ট।
সেদিন সকাল থেকেই গোটা কলকাতার আর্দ্র, স্যাঁতসেঁতে বাতাসে আছড়ে পড়ছিল এক অদ্ভুত, রুদ্ধশ্বাস জাতীয়তাবাদী উন্মাদনার ঢেউ। খালি পায়ের যোদ্ধারা সকালে কালীঘাট মন্দিরে গিয়ে শক্তির দেবী কালীর পায়ে পুষ্পাঞ্জলি নিবেদন করেন এবং কপালে রক্তবর্ণ তিলক কেটে চূড়ান্ত মহারণের জন্য প্রস্তুত হন। চারদিকের দৃশ্য ছিল অভাবনীয়। ইস্ট ইন্ডিয়ান রেলওয়ে খেলা দেখার জন্য বর্ধমান থেকে রানাঘাট পর্যন্ত বিশেষ ট্রেনের ব্যবস্থা করেছিল। রায়গঞ্জ ও বরাহনগর থেকে বিশেষ স্টিমারে করে হাজার হাজার মানুষ কলকাতার দিকে ছুটে আসছিল পাগলের মতো। শ্যামবাজার ও চিৎপুর থেকে আসা প্রতিটি ট্রাম ছিল কানায় কানায় পূর্ণ, আর হাইকোর্ট ও স্ট্র্যান্ড রোডের কাছে তৈরি হয়েছিল এক অভূতপূর্ব, স্তব্ধ করে দেওয়া যানজট।

খেলা নিয়ে মানুষের উন্মাদনা এতটাই শিখরে পৌঁছেছিল যে, ১ বা ২ টাকার সাধারণ টিকিট সেদিন কালোবাজারে ১৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল। সেযুগে ১ পয়সায় একটি সেদ্ধ আলু এবং ১ আনায় পান পাওয়া যেত, তাই ১৫ টাকা ছিল এক বিপুল, অকল্পনীয় অর্থ। ক্যালকাটা এফসি গ্রাউন্ডের ধারণক্ষমতা ছিল মাত্র ১০ হাজার, কিন্তু সেদিন ময়দানে উপস্থিত হয়েছিল প্রায় ৮০ হাজার থেকে ১ লক্ষ মানুষের এক উত্তাল জনসমুদ্র। মাঠে তিল ধারণের জায়গা ছিল না। মানুষ গাছের ডালে, টেলিগ্রাফের খুঁটিতে এবং আশেপাশের বাড়ির ছাদে উঠে খেলা দেখার জন্য ভিড় জমিয়েছিল। মাঠের বাইরে থাকা এই বিশাল জনসমুদ্র, যারা নিজের চোখে খেলা দেখতে পারছিল না, তাদের স্কোরের খবর দেওয়ার জন্য আকাশে ঘুড়ি ওড়ানোর এক অভিনব ব্যবস্থা করা হয়েছিল। সিদ্ধান্ত হয়েছিল, ইংরেজরা গোল করলে উড়বে শোকের প্রতীক কালো ঘুড়ি, আর মোহনবাগান গোল করলে বাংলার আকাশ ছেয়ে যাবে সবুজ-মেরুন ঘুড়িতে।

বিকেল ৫:৩০ মিনিটে রেফারি এইচ. জি. পুলারের তীক্ষ্ণ বাঁশিতে শুরু হলো এই ঐতিহাসিক মহারণ। টসে হেরে মোহনবাগান ইডেন গার্ডেন্সের দিকে এবং ইস্ট ইয়র্কশায়ার রেজিমেন্ট ফোর্ট উইলিয়ামের দিকে মুখ করে খেলা শুরু করল। সেই যুগে ম্যাচ হতো ৫০ মিনিটের, মাঝে ৫ মিনিটের এক ছোট্ট বিরতি থাকত। ময়দানে তখন এক অসম যুদ্ধ—একদিকে সুসজ্জিত ব্রিটিশ সেনা, যাদের পায়ে চামড়ার ভারী বুট এবং শারীরিক শক্তি ছিল দানবীয়; অন্যদিকে বুকের ভেতর আগুন জ্বালিয়ে রাখা খালি পায়ের একদল বাঙালি যুবক। ম্যাচের শুরু থেকেই ইস্ট ইয়র্কশায়ার তাদের পেশিশক্তির নির্লজ্জ প্রয়োগ করে মোহনবাগানের ওপর প্রবল চাপ সৃষ্টি করতে থাকে। কিন্তু মোহনবাগানের জমাট রক্ষণভাগ, বিশেষ করে গোলরক্ষক হীরালাল মুখার্জী এবং ডিফেন্ডার রেভারেন্ড সুধীর চ্যাটার্জি ও ভূতি সুকুল নিজেদের জীবন বাজি রেখে সেই দানবীয় আক্রমণ রুখে দিতে থাকেন। প্রথমার্ধ শেষ হলো গোলশূন্যভাবে।
দ্বিতীয়ার্ধে শুরু হলো এক চরম স্নায়ুযুদ্ধ। বিরতির পর ব্রিটিশরা যেন আরও মরিয়া ও হিংস্র হয়ে ওঠে। খেলার প্রায় ১৫ মিনিট অতিক্রান্ত হওয়ার পর, বক্সের ঠিক বাইরে ইস্ট ইয়র্কশায়ার একটি বিপজ্জনক ফ্রি-কিক পায়। শট নিতে আসেন ইস্ট ইয়র্কশায়ারের সেট-পিস বিশেষজ্ঞ সার্জেন্ট জ্যাকসন। জ্যাকসনের নেওয়া সেই ভয়ংকর বাঁকানো শট মোহনবাগানের ডিফেন্ডার ভূতি সুকুলের গায়ে লেগে সামান্য দিক পরিবর্তন করে, অদম্য গোলরক্ষক হীরালালকে পরাস্ত করে জালে জড়িয়ে যায়। ইস্ট ইয়র্কশায়ার ১-০ গোলে এগিয়ে যায়। বিশাল স্টেডিয়ামে মুহূর্তে নেমে আসে শ্মশানের নিস্তব্ধতা। গ্যালারিতে ব্রিটিশ মেমসাহেবরা উল্লাসে ফেটে পড়েন এবং অনেক ব্রিটিশ সমর্থক মোহনবাগানের কুশপুত্তলিকা পোড়াতে শুরু করেন। আর নিমেষের মধ্যে কলকাতার আকাশে ব্রিটিশদের লিড বোঝাতে উড়তে শুরু করে অশুভ কালো ঘুড়ি।

কিন্তু পিছিয়ে পড়েও দমে যাওয়ার পাত্র ছিল না এই খালি পায়ের লড়াকুরা। গোল খাওয়ার মাত্র ৫ মিনিটের মধ্যেই মোহনবাগান এক ভয়ংকর, প্রলয়ংকরী প্রত্যাঘাত করে। অধিনায়ক শিবদাস ভাদুড়ী তাঁর জাদুকরী, বিদ্যুৎগতির ড্রিবলিংয়ে ব্রিটিশ রক্ষণভাগকে সম্পূর্ণ বোকা বানিয়ে বক্সে ঢুকে পড়েন এবং এক অসামান্য শটে গোল করে দলকে সমতায় ফেরান। আনন্দে, আবেগে ফেটে পড়ে গোটা জনসমুদ্র, আর কালো ঘুড়িগুলোকে সরিয়ে দিয়ে কলকাতার আকাশে সগর্বে উড়তে শুরু করে মোহনবাগানের প্রতীকী সবুজ-মেরুন ঘুড়ি।
এরপর খেলা এগোতে থাকে এক রুদ্ধশ্বাস পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে। উভয় দলই জয়সূচক গোলের জন্য মরিয়া হয়ে ঝাঁপায়। ঘড়ির কাঁটায় আর মাত্র ২ মিনিট বাকি। সময় প্রায় শেষ হয়ে আসছে। এমন সময় মাঝমাঠ থেকে বিদ্যুৎবেগে বল নিয়ে এক মহাকাব্যিক দৌড় শুরু করলেন শিবদাস ভাদুড়ী। সামনে তখন মরিয়া ব্রিটিশ ডিফেন্ডারদের দুর্ভেদ্য প্রাচীর। সব বাধা টপকে শিবদাস নিখুঁত একটি ক্রস বাড়ালেন পেনাল্টি বক্সে ফাঁকায় থাকা অতিকায় স্ট্রাইকার অভিলাষ ঘোষের দিকে। অভিলাষ চলতি বলটি রিসিভ করলেন। সামনে কেবল অসহায় ব্রিটিশ গোলরক্ষক ক্রেসি। গোটা স্টেডিয়ামের লক্ষ লক্ষ মানুষের শ্বাস তখন আক্ষরিক অর্থেই বন্ধ। অভিলাষ তাঁর সমস্ত জমানো ক্ষোভ আর শক্তি প্রয়োগ করে ক্রেসির দিকে এক বজ্রকঠিন শট নিলেন। বলটি ইংরেজদের অহংকারের জাল ছিন্ন করে তীব্র বেগে ঢুকে পড়ল গোলের ভেতর! ঘড়ির কাঁটায় তখন ৮৮ মিনিট। মোহনবাগান ২, ইস্ট ইয়র্কশায়ার রেজিমেন্ট ১! এর কয়েক মুহূর্ত পরেই রেফারি এইচ. জি. পুলারের লম্বা বাঁশি বেজে উঠল। খেলা শেষ! পরাধীন ভারতের মাটিতে একদল খালি পায়ের বাঙালি যুবক বুট-পরা ব্রিটিশ সামরিক বাহিনীকে হারিয়ে প্রথমবারের মতো আই.এফ.এ শিল্ড জয় করল।
রেফারির বাঁশি বাজার সাথে সাথেই ক্যালকাটা ফুটবল গ্রাউন্ডে এক অভূতপূর্ব, অকল্পনীয় ছবি নেমে এল। রয়টার্স তাদের টেলিগ্রামে সুদূর ইংল্যান্ডে খবর পাঠাল, “এই দৃশ্য বর্ণনাতীত; বাঙালিরা আনন্দে নিজেদের গায়ের জামা ছিঁড়ে শূন্যে ওড়াচ্ছে।” আকাশে তখন উড়ছে অগণিত বিজয়ী সবুজ-মেরুন ঘুড়ি। দাম্ভিক ব্রিটিশ মেমসাহেব এবং সাহেবরা মাথা নিচু করে, অপমানিত হয়ে দ্রুত মাঠ ছাড়তে বাধ্য হলেন। সবচেয়ে মন ছুঁয়ে যাওয়া দৃশ্যটি তৈরি হলো যখন ধর্মতলার স্থানীয় মুসলিমরা ব্যান্ডপার্টি নিয়ে হিন্দু ভাইদের সাথে এই বাঁধভাঙা উৎসবে যোগ দিলেন। ‘দি মুসলমান’ পত্রিকা লিখল, মুসলিম স্পোর্টিং ক্লাবের সদস্যরা হিন্দু ভাইদের এই জয়ে আনন্দে পাগলপ্রায় হয়ে মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছেন।
খেলোয়াড়দের যখন ঘোড়ার গাড়িতে করে রাজকীয় শোভাযাত্রায় বের করা হলো, তখন পথে এক বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ দলের একমাত্র বুট-পরা ডিফেন্ডার রেভারেন্ড সুধীর চ্যাটার্জিকে ফোর্ট উইলিয়ামের চূড়ায় উড়ন্ত ব্রিটিশ পতাকা ‘ইউনিয়ন জ্যাক’-এর দিকে আঙুল দেখিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “শিল্ড তো জিতলে, কিন্তু ওই পতাকাটা কবে নামবে?” সুধীর বাবু বা ভিড়ের মধ্যে থেকে কেউ একজন দৃঢ়স্বরে উত্তর দিলেন, “মোহনবাগান যেদিন আবার এই শিল্ড জিতবে, সেদিনই ওটা নামবে।” ইতিহাসের কী এক অদ্ভুত, রোমাঞ্চকর সমাপতন! এই ঘটনার ঠিক ৩৬ বছর পর, ১৯৪৭ সালে, যেদিন ভারত ব্রিটিশদের হাত থেকে স্বাধীনতা লাভ করল, ঠিক সেই বছরই মোহনবাগান দ্বিতীয়বারের জন্য আই.এফ.এ শিল্ড জয় করেছিল।
বিজয়মিছিল যখন ওয়েলিংটন স্কোয়ার পার হচ্ছে, তখন চারপাশের বাড়ির ছাদ থেকে মহিলারা শঙ্খ বাজিয়ে এবং মঙ্গল প্রদীপ জ্বেলে এই বীর যোদ্ধাদের বরণ করে নিলেন। গোটা কলকাতা শহর সেদিন অকাল দীপাবলিতে সেজে উঠেছিল, কেবল একটি জায়গা ছাড়া—চৌরঙ্গী স্কোয়ার। ব্রিটিশ অধ্যুষিত এই বিলাসবহুল ‘সাহেব পাড়া’ সেদিন অপমান আর শোকে গভীর অন্ধকারে ডুবে ছিল।
পরদিন সংবাদপত্রের পাতায় পাতায় ছিল কেবলই এই মহাকাব্যের স্তুতি। ‘অমৃতবাজার পত্রিকা’ এই ১১ জন অকুতোভয় যোদ্ধাকে ‘অমর একাদশ’ আখ্যা দিল। ব্রিটিশদের অন্যতম মুখপত্র ‘দি ইংলিশম্যান’ বাধ্য হয়ে স্বীকার করল, কংগ্রেস এবং স্বদেশীরা যা করতে ব্যর্থ হয়েছে, মোহনবাগান তা করে দেখিয়েছে; তারা প্রমাণ করে দিয়েছে যে ব্রিটিশরা অজেয় নয়। দেশীয় পত্রিকা ‘নায়ক’ ব্রিটিশদের তীব্র উপহাস করে লিখল, ভাত-খাওয়া, ম্যালেরিয়ায় ভোগা, খালি পায়ের বাঙালিরা আজ গোমাংস-খাওয়া, পেশিবহুল, বুট-পরা ব্রিটিশদের তাদের নিজেদের খেলাতেই হারিয়ে দিয়েছে। এই ঐতিহাসিক জয় বাঙালিদের ‘অসামরিক’ বা ‘মেয়েলি’ অপবাদ চিরতরে ঘুচিয়ে দিয়ে তাদের হারানো সম্মান ফিরিয়ে দিয়েছিল।

এই জয়ের প্রবল ঢেউ আছড়ে পড়ল ব্যবসাতেও। স্ট্যান্ডার্ড সাইকেল কোম্পানি তাদের পণ্যের সাথে ‘অমর একাদশ’-এর ছবি বিনা মূল্যে বিলি করতে শুরু করল, যার প্রায় এক লক্ষ কপি বিক্রি হয়েছিল। হ্যাল্ড অ্যান্ড চ্যাট নামক বাদ্যযন্ত্রের দোকান সমস্ত মোহনবাগান সদস্যদের জন্য হারমোনিয়ামে বিশেষ ছাড় ঘোষণা করল। গ্রেট ন্যাশনাল থিয়েটার তাদের নতুন নাটক ‘বাজিরাও’-এর বিজ্ঞাপনে বুক চিতিয়ে লিখল: “মোহনবাগান শিল্ড জিতেছে, আর বাজিরাও জিতেছে যুদ্ধ!”
এই জয় কেবল একটি ট্রফি জয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। এটি ছিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক দম্ভের কফিনে গাঁথা শেষ পেরেক। এই জয়ের ফলে গোটা দেশে এমন এক ভয়ংকর জাতীয়তাবাদী উন্মাদনা ও ব্রিটিশ বিরোধী স্ফুলিঙ্গ তৈরি হয়েছিল যে, ব্রিটিশ প্রশাসন রীতিমতো প্রমাদ গোনে। এই ঘটনার কয়েক মাসের মধ্যেই, ১৯১১ সালের ডিসেম্বরে, ব্রিটিশ সরকার বাধ্য হয়ে বঙ্গভঙ্গ রদ করে এবং ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী কলকাতা থেকে দিল্লিতে সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে। ২৯শে জুলাইয়ের সেই বিকেলটি সমগ্র বিশ্বকে প্রমাণ করে দিয়েছিল যে, বুট বা চামড়ার আবরণের চেয়ে বুকের ভেতরের আগুন অনেক বেশি শক্তিশালী। সেই থেকেই ২৯শে জুলাই দিনটি ভারতের ইতিহাসে ‘মোহনবাগান দিবস’ হিসেবে অমর হয়ে আছে। পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার এই ফুটবল-রূপকথা তাই শুধু খেলার ইতিহাস নয়, ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের এক অবিচ্ছেদ্য এবং চিরন্তন জ্বলন্ত অধ্যায়।
পরবর্তী অধ্যায়ে সমাগত…