প্রথম অধ্যায়: খালি পায়ের বিপ্লব
ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধ। গঙ্গার বুক চিরে ধেয়ে আসা স্যাঁতসেঁতে হাওয়া আর ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ঔদ্ধত্যে মোড়া এক অদ্ভুত শহর—কলকাতা। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাত ধরে এদেশের মাটিতে ততদিনে শিকড় গেড়েছে সাহেবদের প্রিয় খেলা—ফুটবল। উত্তর কলকাতার শ্যামবাজার এলাকার ১ নং ফরিয়াপুকুর স্ট্রিটে তখন মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে বিশিষ্ট পাট ব্যবসায়ী কীর্তিচন্দ্র মিত্রের সুবিশাল রাজপ্রাসাদ। বাংলার প্রথম সিভিল ইঞ্জিনিয়ার নীলমণি মিত্রের নকশায় তৈরি শ্বেতপাথরের সেই অপরূপ প্রাসাদের নাম ছিল—’মোহনবাগান ভিলা’। এই ভিলাটি যে জমির ওপর দাঁড়িয়ে ছিল, সেটি এককালে রাজা নবকৃষ্ণ দেবের জ্যেষ্ঠ পুত্র রাজা গোপী মোহন দেবের বাগান ছিল।

সেই রাজকীয় ভিলার ঠিক পাশেই ছিল ১৩ বিঘার এক বিস্তীর্ণ সবুজ মাঠ। প্রতিদিন পড়ন্ত বিকেলে সেই মাঠে ঘাম ঝরায় একদল উদ্দাম তরুণ, যাদের দলটির নাম ছিল ‘স্টুডেন্টস ইউনিয়ন’। মূলত স্থানীয় স্কুলের ছাত্র এবং কয়েকজন কলেজ পড়ুয়াকে নিয়ে গড়া এই দলটির অঘোষিত নেতা ছিলেন উমেশচন্দ্র মজুমদার, যাঁকে ময়দান চিনত ‘দুখিরাম’ নামে। সাহেবদের দাম্ভিক বুটের আঘাতের মোকাবিলা করতে বাঙালি ছেলেরাও যে প্রস্তুত, সেই প্রতিবাদের স্ফুলিঙ্গ তখন ওই মাঠের কোণাতেই নীরবে দানা বাঁধছিল।
কিন্তু ১৮৮৪ সালে হঠাৎ করেই মোহনবাগান ভিলার সেই শান্ত মাঠে নেমে এল অনাকাঙ্ক্ষিত এক কালবৈশাখীর প্রমত্ত ঝড়। ফুটবলে সাহেবদের মতো বুট পায়ে খেলা উচিত নাকি বাঙালির চিরপরিচিত খালি পায়ে—এই নীতিগত প্রশ্নকে কেন্দ্র করে দুখিরাম মজুমদারের সাথে ভিলার অন্যান্য খেলোয়াড়দের তীব্র মতবিরোধ দেখা দেয়।
দুখিরাম ছিলেন দূরদর্শী। তিনি যুক্তি দিয়েছিলেন, ইংরেজদের সাথে সমানে সমানে লড়তে গেলে তাদেরই অস্ত্র, অর্থাৎ পায়ে চামড়ার ভারী বুট নিতান্তই আবশ্যক। কিন্তু ভিলার অধিকাংশ ছেলেরা খালি পায়েই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করত, তাছাড়া সেই যুগে বুট কিনে খেলার মতো আর্থিক সামর্থ্যও অনেকের ছিল না। মতের এই অমিল চরমে পৌঁছায়। ক্ষুব্ধ দুখিরাম শেষ পর্যন্ত স্টুডেন্টস ইউনিয়ন ছেড়ে বেরিয়ে যান এবং শ্যামপুকুরে মহারাজা দুর্গা চরণ লাহার তেলিপাড়া মাঠে গিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন ‘এরিয়ান্স এফসি’ (Aryans FC)। অন্যদিকে, আরও কিছু খেলোয়াড় শ্যাম স্কোয়ারে গিয়ে তৈরি করেন ‘বাগবাজার ক্লাব’ (যাদের পৃষ্ঠপোষক ছিল বাগবাজারের সেন পরিবার)।
দুখিরামের এই দলত্যাগের ফলে ভিলার যে অদম্য ছেলেরা নিজেদের মাটি কামড়ে পড়ে রইল, তারা হঠাৎ করেই হয়ে পড়ল সম্পূর্ণ একা, ক্লাবহীন এবং অভিভাবকহীন। তাদের না রইল কোনো নির্দিষ্ট নাম, না রইল অন্যান্য শক্তিশালী দলের সাথে প্রতিযোগিতায় নামার মতো কোনো সুনির্দিষ্ট মঞ্চ। কিন্তু সেই তরুণদের চোখে যে ফুটবল খেলার নেশা আর ব্রিটিশদের হারানোর এক সুপ্ত আগুন জ্বলছিল, তা নিভে যেতে দেয়নি উত্তর কলকাতার তিনটি অভিজাত ও বিদ্যানুরাগী পরিবার—বসু, মিত্র এবং সেন পরিবার।
অবশেষে এল সেই ঐতিহাসিক দিন। ১৫ই আগস্ট, ১৮৮৯ সাল। কলকাতার আকাশে তখন শ্রাবণের মেঘভারানত রূপ। সেই বৃষ্টিভেজা বিকেলে ১৪ নং বলরাম ঘোষ স্ট্রিটে বসু পরিবারের বাসভবনে এক অতি গুরুত্বপূর্ণ সভার আয়োজন করা হয়। ঘড়ির কাঁটা এগোচ্ছে, আর ঘরের ভেতর চলছে গভীর ও সুদীর্ঘ আলোচনা। তিনটি অভিজাত পরিবারের উপস্থিতিতে, বাংলার যুবসমাজের মধ্যে খেলাধুলার প্রসার ঘটানোর এক পবিত্র উদ্দেশ্য নিয়ে জন্ম নিল এক নতুন ফুটবল ক্লাব। যে ভিলার মাঠে ছেলেরা খেলত, তার প্রতি সম্মান জানিয়ে এবং স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা রেখে ক্লাবের নামকরণ করা হলো— ‘মোহনবাগান স্পোর্টিং ক্লাব’ (Mohun Bagan Sporting Club)।
ক্লাবের প্রথম সভাপতি (President) হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করলেন বিশিষ্ট আইনজীবী এবং পরবর্তীতে জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি ভূপেন্দ্রনাথ বসু। প্রথম সেক্রেটারি নির্বাচিত হলেন জ্যোতীন্দ্রনাথ বসু। ক্লাবের প্রথম খেলাটি আয়োজিত হয় ইডেন হিন্দু হোস্টেলের (Eden Hindu Hostel) ছাত্রদের বিরুদ্ধে। মণিলাল সেনের অধিনায়কত্বে গিরীন বসু, প্রমথনাথ চট্টোপাধ্যায়, রাম গোস্বামী, শরৎ মিত্রদের মতো একঝাঁক তরুণ সেদিন বুকভরা স্পর্ধা নিয়ে মাঠে নেমেছিল। ম্যাচটিতে তারা ১-০ গোলে পরাজিত হলেও, সেদিন কলকাতার বুকে যে অদম্য জেদের জন্ম হয়েছিল, তা ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে।
ঠিক এক বছর পর, ১৮৯০ সালে ক্লাবের প্রথম বার্ষিকী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে আমন্ত্রিত হয়ে এলেন প্রেসিডেন্সি কলেজের স্বনামধন্য অধ্যাপক এফ. জে. রো (F. J. Rowe)। তিনি অত্যন্ত বিস্মিত হয়ে লক্ষ্য করলেন, এই ক্লাবে বন্দুক চালনা (rifle shooting) বা ছিপ দিয়ে মাছ ধরার (angling) মতো কোনো ‘স্পোর্টিং’ (Sporting) বা অ-অ্যাথলেটিক কার্যকলাপ তো হয় না, ছেলেরা কেবল ফুটবল বা অ্যাথলেটিক্সে মগ্ন! তাঁর এই যৌক্তিক পরামর্শকে সসম্মানে গ্রহণ করে তৎক্ষণাৎ ‘স্পোর্টিং’ শব্দটি বাদ দেওয়া হয় এবং ক্লাবের নতুন নামকরণ হয়— ‘মোহনবাগান অ্যাথলেটিক ক্লাব’ (Mohun Bagan Athletic Club)।
এই সময় কীর্তিচন্দ্র মিত্রের উত্তরাধিকারী প্রিয়নাথ মিত্র ক্লাবের খেলোয়াড়দের জন্য এক অনন্য পরিচয়ের ব্যবস্থা করেন। তিনি ওল্ড কোর্ট হাউস স্ট্রিটের বিখ্যাত ইউরোপীয় দর্জির দোকান মেসার্স র্যাঙ্কিন (Messrs Rankin) থেকে মোহনবাগানের খেলোয়াড়দের জন্য তৈরি করিয়ে আনেন সেই ঐতিহাসিক সবুজ-মেরুন (Green-Maroon) রঙের জার্সি। ক্লাবের শৃঙ্খলা এতটাই কড়া ছিল যে, খেলোয়াড়দের নৈতিক ও সামাজিক মূল্যবোধ গড়ে তোলার ওপর জোর দেওয়া হতো; কেউ স্কুল বা কলেজে ফেল করলে তাকে মাঠে নামতে দেওয়া হতো না।
১৮৯১ সালে মোহনবাগান ভিলা ভেঙে ফেলার কারণে ক্লাবটি তাদের সেই জন্মভূমির চেনা মাঠটি হারায়। শুরু হয় এক কঠিন যাযাবর জীবন। কিন্তু কোনো বাধাই তাদের দমিয়ে রাখতে পারেনি। ১৮৯৩ সালে তারা প্রথম ‘কোচবিহার কাপ’-এ অংশ নেয় এবং ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান আর্মির দলগুলোর মুখোমুখি হয়। কিন্তু শুরুর দিকের বছরগুলোতে ব্রিটিশ বা অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান দলগুলোর পেশিশক্তির কাছে বারবার হার মানতে হচ্ছিল মোহনবাগানকে।
ঠিক সেই সময়েই, নতুন শতাব্দীর শুরুতে (১৯০০ সালে), ক্লাবের সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করলেন এক লৌহকঠিন ব্যক্তিত্ব—শৈলেন্দ্রনাথ বসু (শৈলেন বাবু)। তিনি ছিলেন ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান আর্মির একজন ‘সুবেদার-মেজর’। সেনাবাহিনীর লোক হওয়ায় শ্বেতাঙ্গ সাহেবদের মানসিকতা, তাদের পেশিশক্তি এবং ব্রিটিশদের সামরিক শৃঙ্খলার সাথে তিনি ছিলেন খুব ভালোভাবেই পরিচিত। এছাড়া, এই সময়েই তিনি উদ্যোগ নিয়ে ময়দানে (Maidan) মোহনবাগানের নিজস্ব তাঁবু (Club Tent) স্থাপনের ব্যবস্থা করেন, যার ফলে ক্লাবের যাযাবর জীবনের অবসান ঘটে।
শৈলেন বাবু খুব দ্রুতই বুঝতে পেরেছিলেন যে, সাহেবদের হারাতে গেলে কেবল মাঠের বাইরের জাতীয়তাবাদের জিগির বা আবেগের আস্ফালন যথেষ্ট নয়। ব্রিটিশ রেজিমেন্টগুলোর দানবীয় শারীরিক শক্তির মোকাবিলা করতে গেলে প্রয়োজন নিখুঁত কৌশল এবং ইস্পাতকঠিন ফিটনেস। তাঁর কড়া এবং আপোসহীন নজরদারিতে মোহনবাগান তাঁবুতে শুরু হলো এক আমূল পরিবর্তন। তিনি খেলোয়াড়দের জন্য ইউরোপীয় খেলার ধরণ এবং সামরিক বাহিনীর মতো কঠোর শারীরিক কসরতের রুটিন চালু করলেন।
তিনি দলে আমদানি করলেন ক্ল্যাসিক ২-৩-৫ (2-3-5 Pyramid) ফরমেশন—যেখানে দুজন ফুল-ব্যাক, তিনজন হাফ-ব্যাক এবং পাঁচজন ফরোয়ার্ড থাকত। এই ছকের মূল উদ্দেশ্য ছিল ব্রিটিশদের লম্বা পাসের ফুটবলকে অকেজো করে দিয়ে নিজেদের মধ্যে ছোট ছোট পাসের (short-passing) জাদুকরী ফুটবল খেলা।
শৈলেন বসুর সবচেয়ে বড় অবদান ছিল খেলোয়াড়দের মানসিকতার পরিবর্তন (change in mindset)। সেই সময় চামড়ার হাতে সেলাই করা বুটের দাম ছিল ৭ টাকা ৪ আনা, যা একজন সাধারণ ভারতীয়র কাছে প্রচুর অর্থ। ব্রিটিশরা ভারতীয়দের বুট না থাকাকে তাদের দারিদ্র্য এবং শারীরিক দুর্বলতা (‘অসামরিক’ বা effeminate) হিসেবে উপহাস করত।
কিন্তু শৈলেন বাবু এবং দলের জাদুকর স্ট্রাইকার ও অধিনায়ক শিবদাস ভাদুড়ী এই খালি পা-কেই দলের সবচেয়ে বড় মারণাস্ত্রে পরিণত করার ছক কষলেন। তাঁরা বুঝতে পেরেছিলেন যে, ময়দানের কাদামাখা পিচ্ছিল মাঠে সাহেবদের লোহার স্টাড দেওয়া চামড়ার ভারী সামরিক বুট যখন জলে ভিজে কাদায় আটকে ভারী হয়ে যাবে, তখন খালি পায়ের বাঙালি ছেলেরা বলের ওপর অবিশ্বাস্য নিয়ন্ত্রণ (tactile ball control) আর অসামান্য গতি (acceleration) নিয়ে ছুটে যেতে পারবে। খালি পায়ে দৌড়ালে শরীরের ভরকেন্দ্র (center of gravity) নিচে থাকে, যা কাদা মাঠে চটজলদি দিক পরিবর্তন করতে এবং ড্রিবলিং করতে সাহায্য করে। অর্থাৎ, যা ছিল ব্রিটিশদের চোখে বাঙালির চরম দুর্বলতা, শৈলেন বাবু তাকেই বানিয়ে ফেললেন মোহনবাগানের সবচেয়ে বড় কৌশলগত সুবিধা।
খালি পায়ে আক্রমণের কৌশল তো তৈরি হলো, কিন্তু দলের প্রতিরক্ষার (Defense) জন্য একজন বুট-পরা খেলোয়াড়ের প্রয়োজনীয়তা শৈলেন বাবু ঠিকই অনুভব করেছিলেন। ব্রিটিশদের আকাশপথে আসা বিপজ্জনক শটগুলো (aerial balls) ফেরাতে এবং সাহেব ফরোয়ার্ডদের ভয়ানক ও নির্মম ট্যাকেল (physical tackles) সামলাতে এমন একজন ডিফেন্ডার দরকার ছিল, যে বুক চিতিয়ে ওই ভারী বুটের আঘাত সহ্য করতে পারবে এবং বল ক্লিয়ার করতে পারবে।
এই কৌশলগত কারণেই তিনি ন্যাশনাল ক্লাব (National Club) থেকে নিয়ে এলেন রেভারেন্ড সুধীর কুমার চ্যাটার্জিকে। সুধীর বাবু ছিলেন গোটা দলের একমাত্র খেলোয়াড়, যিনি বুট পায়ে মাঠে নামতেন। বাকি দশজন খেলোয়াড়ই খেলতেন সম্পূর্ণ খালি পায়ে।
এভাবেই, একসময় বুট পরা নিয়ে যে দলটিতে ভাঙন ধরেছিল (দুখিরামের চলে যাওয়া), সেই দলটিতেই শৈলেন বসুর হাড়ভাঙা সামরিক অনুশীলন, সুধীর চ্যাটার্জির বুট-পরা রক্ষণভাগ এবং শিবদাস ভাদুড়ীর ছোট ছোট পাসের জাদুকরী ‘খালি পায়ের’ রণকৌশল এক অদ্ভুত ভারসাম্য তৈরি করল। মোহনবাগান তখন আর কেবল বিনোদনের জন্য তৈরি একটি সাধারণ স্পোর্টিং বা অ্যাথলেটিক ক্লাব নেই; তারা পরিণত হয়েছে এক দুর্ধর্ষ, যুদ্ধংদেহী ইউনিটে। তারা হয়ে উঠেছে ভারতীয় জাতীয়তাবাদের এক জ্বলন্ত প্রতীক, যারা শ্বেতাঙ্গ প্রভুদের চোখে চোখ রেখে লড়াই করার জন্য নিজেদের নীরবে প্রস্তুত করছিল। ময়দানের সবুজ ঘাসে তখন বোনা হয়ে গেছে এক মহাকাব্যের বীজ, আর ব্রিটিশ সাম্রাজ্য তখনও ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি যে, এই খালি পায়ের তরুণেরাই একদিন তাদের ঔপনিবেশিক অহংকারের দুর্গ চিরতরে ধুলিস্যাৎ করে দেবে।