Ex Libris
Amar Mohunbagan
Bound
আপনার ব্রাউজারে

ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধ। গঙ্গার বুক চিরে ধেয়ে আসা স্যাঁতসেঁতে হাওয়া আর ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ঔদ্ধত্যে মোড়া এক অদ্ভুত শহর—কলকাতা। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাত ধরে এদেশের মাটিতে ততদিনে শিকড় গেড়েছে সাহেবদের প্রিয় খেলা—ফুটবল। উত্তর কলকাতার শ্যামবাজার এলাকার ১ নং ফরিয়াপুকুর স্ট্রিটে তখন মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে বিশিষ্ট পাট ব্যবসায়ী কীর্তিচন্দ্র মিত্রের শ্বেতপাথরের সুবিশাল রাজপ্রাসাদ—’মোহনবাগান ভিলা’


। সেই রাজকীয় ভিলার ঠিক পাশেই এক বিস্তীর্ণ সবুজ মাঠ। প্রতিদিন পড়ন্ত বিকেলে সেই মাঠে ঘাম ঝরায় একদল উদ্দাম তরুণ, যাদের দলটির নাম ছিল ‘স্টুডেন্টস ইউনিয়ন’
। তাদের নেতা উমেশচন্দ্র মজুমদার, যাঁকে ময়দান চিনত ‘দুখিরাম’ নামে
। সাহেবদের দাম্ভিক বুটের আঘাতের মোকাবিলা করতে বাঙালি ছেলেরাও যে প্রস্তুত, সেই প্রতিবাদের স্ফুলিঙ্গ তখন ওই মাঠের কোণাতেই নীরবে দানা বাঁধছিল।
কিন্তু ১৮৮৪ সালে হঠাৎ করেই মোহনবাগান ভিলার সেই শান্ত মাঠে নেমে এল অনাকাঙ্ক্ষিত এক কালবৈশাখীর প্রমত্ত ঝড়
। ফুটবলে বুট পায়ে খেলা উচিত নাকি বাঙালির চিরপরিচিত খালি পায়ে—এই নীতিগত প্রশ্নকে কেন্দ্র করে দুখিরাম মজুমদারের সাথে ভিলার অন্যান্য খেলোয়াড়দের তীব্র মতবিরোধ দেখা দেয়
। ইংরেজদের সাথে সমানে সমানে লড়তে গেলে বুট যে নিতান্তই আবশ্যক, এই যুক্তিতে অনড় দুখিরাম দল ছেড়ে বেরিয়ে যান এবং শ্যামপুকুরে গিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন ‘এরিয়ান্স এফসি’ (Aryans FC)
। অন্যদিকে, আরও কিছু খেলোয়াড় শ্যাম স্কোয়ারে গিয়ে তৈরি করেন ‘বাগবাজার ক্লাব’

দলবদলের এই প্রবল ঝড়ে ভিলার যে অদম্য ছেলেরা নিজেদের মাটি কামড়ে পড়ে রইল, তারা হঠাৎ করেই হয়ে পড়ল সম্পূর্ণ একা, ছন্নছাড়া এবং অভিভাবকহীন
। তাদের না রইল কোনো নির্দিষ্ট ক্লাব, না রইল অন্যান্য শক্তিশালী দলের সাথে প্রতিযোগিতায় নামার মতো কোনো সুনির্দিষ্ট মঞ্চ
। কিন্তু সেই তরুণদের চোখে যে ফুটবল খেলার নেশা আর ব্রিটিশদের হারানোর এক সুপ্ত আগুন জ্বলছিল, তা নিভে যেতে দেয়নি উত্তর কলকাতার তিনটি অভিজাত ও বিদ্যানুরাগী পরিবার—বসু, মিত্র এবং সেন পরিবার

অবশেষে এল সেই ঐতিহাসিক দিন। ১৫ই আগস্ট, ১৮৮৯ সাল
। কলকাতার আকাশে তখন শ্রাবণের মেঘভারানত রূপ। সেই বৃষ্টিভেজা দিনে বসু পরিবারের বাসভবনে এক অতি গুরুত্বপূর্ণ সভার আয়োজন করা হয়
। ঘড়ির কাঁটা এগোচ্ছে, আর ঘরের ভেতর চলছে গভীর ও সুদীর্ঘ আলোচনা। তিনটি অভিজাত পরিবারের উপস্থিতিতে, বাংলার যুবসমাজের মধ্যে খেলাধুলার প্রসার ঘটানোর এক পবিত্র উদ্দেশ্য নিয়ে জন্ম নিল এক নতুন ফুটবল ক্লাব
। যে ভিলার মাঠে ছেলেরা খেলত, তার প্রতি সম্মান জানিয়ে এবং স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা রেখে ক্লাবের নামকরণ করা হলো— ‘মোহনবাগান স্পোর্টিং ক্লাব’ (Mohun Bagan Sporting Club)
। ক্লাবের প্রথম সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করলেন বিশিষ্ট আইনজীবী এবং পরবর্তীতে জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি ভূপেন্দ্রনাথ বসু
। প্রথম সেক্রেটারি নির্বাচিত হলেন জ্যোতীন্দ্রনাথ বসু

ক্লাব তো প্রতিষ্ঠিত হলো, এবার মাঠে নামার পালা। মোহনবাগান স্পোর্টিং ক্লাবের প্রথম ম্যাচটি আয়োজিত হয় ইডেন হিন্দু হোস্টেলের (Eden Hindu Hostel) ছাত্রদের বিরুদ্ধে
। মণিলাল সেনের অধিনায়কত্বে গিরীন বসু, প্রমথনাথ চট্টোপাধ্যায়দের মতো একঝাঁক তরুণ সেদিন বুকভরা স্পর্ধা নিয়ে মাঠে নেমেছিল
। ম্যাচটিতে তারা ১-০ গোলে পরাজিত হলেও, সেদিন কলকাতার বুকে যে অদম্য জেদ আর সংঘবদ্ধ প্রতিবাদের জন্ম হয়েছিল, তা হার মানতে শেখেনি

ঠিক এক বছর পর, ক্লাবের প্রথম বার্ষিকী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে আমন্ত্রিত হয়ে এলেন প্রেসিডেন্সি কলেজের স্বনামধন্য অধ্যাপক এফ. জে. রো (F. J. Rowe)
। তিনি অত্যন্ত বিস্মিত হয়ে লক্ষ্য করলেন, এই ক্লাবে বন্দুক চালনা (rifle shooting) বা ছিপ দিয়ে মাছ ধরার (angling) মতো কোনো ‘স্পোর্টিং’ বা অ-অ্যাথলেটিক কার্যকলাপ তো হয় না
! তাঁর এই যৌক্তিক পরামর্শকে সসম্মানে গ্রহণ করে তৎক্ষণাৎ ‘স্পোর্টিং’ শব্দটি বাদ দেওয়া হয় এবং ক্লাবের নতুন নামকরণ হয়— ‘মোহনবাগান অ্যাথলেটিক ক্লাব’ (Mohun Bagan Athletic Club)
। এই সময় কীর্তিচন্দ্র মিত্রের উত্তরাধিকারী প্রিয়নাথ মিত্র ওল্ড কোর্ট হাউস স্ট্রিটের বিখ্যাত ইউরোপীয় দর্জির দোকান মেসার্স র‍্যাঙ্কিন (Messrs Rankin) থেকে মোহনবাগানের খেলোয়াড়দের জন্য তৈরি করিয়ে আনেন সেই ঐতিহাসিক সবুজ-মেরুন (Green-Maroon) রঙের জার্সি

তবে এই নতুন ক্লাবের পথচলা একেবারেই মসৃণ ছিল না। ১৮৯১ সালে মোহনবাগান ভিলা ভেঙে ফেলার কারণে ক্লাবটি তাদের সেই জন্মভূমির চেনা মাঠটি হারায়
। শুরু হয় এক কঠিন যাযাবর জীবন
। কখনও মহারাজা দুর্গা চরণ লাহার সহায়তায় লাহা কলোনির মাঠে, কখনও বা বাগবাজারের শ্যাম স্কোয়ারে তারা নিজেদের সাময়িক ঠিকানা খুঁজে নেয়। কিন্তু কোনো বাধাই তাদের দমিয়ে রাখতে পারেনি। ১৮৯৩ সালে মোহনবাগান প্রথমবারের মতো পা রাখে প্রতিযোগিতামূলক টুর্নামেন্টে
। ‘কোচবিহার কাপ’-এ (Coochbehar Cup) অংশগ্রহণ করে তারা সরাসরি ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান আর্মি এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠিত ক্লাবগুলোর মুখোমুখি হয়
। এই সময়টি ছিল তাদের নিজেদের নতুন করে গড়ে তোলার, পায়ের পেশি আর বুকের পাঁজরে ইস্পাতের মতো কাঠিন্য আর ব্রিটিশ-বিরোধিতার এক অদ্ভুত বারুদ জমিয়ে তোলার সময়।
এভাবেই ঘাত-প্রতিঘাত, হার-জিত, মাঠ হারানোর যন্ত্রণা এবং সীমাহীন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে কেটে যায় কয়েকটি বছর। অবশেষে কলকাতার দিগন্তে উঁকি দেয় এক নতুন শতাব্দীর বহু প্রতীক্ষিত ভোর— ১৯০০ সাল। এই বছরটি মোহনবাগানের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ও রোমাঞ্চকর মোড় নিয়ে আসে। প্রেসিডেন্সি কলেজের সাথে অংশীদারিত্বের মাধ্যমে মোহনবাগান অ্যাথলেটিক ক্লাব কলকাতার সুবিশাল ও ঐতিহাসিক ‘ময়দানে’ (Maidan) তাদের নিজস্ব ক্লাবের তাঁবু (Club Tent) স্থাপন করার এবং খেলার মাঠ ভাগ করে নেওয়ার এক দুর্লভ সুযোগ পায়

শ্যামবাজারের এক অখ্যাত কোণের একটি ছোট্ট ভিলা থেকে শুরু হওয়া সেই ছন্নছাড়া ছেলেদের জেদী দলটি, আজ সব বাধা পেরিয়ে এসে দাঁড়িয়েছে কলকাতার প্রাণকেন্দ্র—ময়দানের বিস্তীর্ণ সবুজ ঘাসে
। তাদের চোখে তখন এক নতুন পৃথিবীর স্বপ্ন, আর খালি পায়ে ইতিহাস গড়ার এক অদম্য বারুদ, যা আগামী দিনে গোটা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অহংকারের ভিত কাঁপিয়ে দেওয়ার জন্য নীরবে প্রস্তুত হচ্ছিল।